
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে কাঁধে একটি মৃতদেহ নিয়ে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া বেশ কিছু ব্যক্তির পথ আটকাতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন পুলিশ আধিকারিককে। পাশাপাশি, মৃতদেহবাহী ব্যক্তিদের আটকানোর মুহূর্তে তাদের উদ্দেশ্যে এক পুলিশ অফিসারকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘অনেক সমস্যা হয়ে যাবে।’ ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন নতুন ভারতের বিজেপি শাসিত একটি রাজ্যে উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের চাপে পুলিশ একজন দলিত ব্যক্তির মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করতে বাধা দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এই হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন মোদীজির ভারতবর্ষ। অন্য দেশ ক্যান্সার/ এইডস এর প্রতিষেধক বানাচ্ছে সেখানে ভারতে বিজেপি শাসিত রাজ্যের পুলিশ (আইনের রক্ষক) জাতিবাদের সূত্র ধরে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করতে বাধা দিচ্ছে। এবার বুঝতে পারছেন তো আগেকার দিনে কেন হিন্দু দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা অন্য ধর্মে রূপান্তরিত হতে বাধ্য হয়ে ছিল।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিও-র সঙ্গে বর্ণ বৈষম্যের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং সেটি উত্তর প্রদেশের আমেঠি জেলার জগদীশপুরে মনোজ সিং নামক এক ব্যক্তির খুনের অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে তার দেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের রাস্তা অবরোধের চেষ্টার সময় পুলিশের হস্তক্ষেপের দৃশ্য।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর প্রদেশের আমেঠি জেলায় এক ব্যক্তির খুনের ঘটনার পর পুলিশের তরফে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে মৃতদেহ নিয়ে রাস্তায় উপস্থিত হলে পুলিশ তাদেরকে বাধা প্রদান করে এবং তাদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করে।
এরপর এই সংক্রান্ত আরও অনুসন্ধান চালালে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভারত সমাচারের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই ঘটনার আরও একাধিক ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “আমেঠির জগদীশপুর থানার গুঙ্গেমাউ গ্রামে এক শ্মশানের তত্ত্বাবধায়ককে হত্যা। ঘটনার পর খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে মৃতদেহ রিকশায় করে রাস্তা অবরোধ করার সময় পুলিশের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা।”
অন্যদিকে, দৈনিক ভাস্করের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জগদীশপুর থানার হরিমোউ গ্রামের নির্মাণাধীন একটি শ্মশানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতেন পাশ্ববর্তী গুঙ্গেমাউ গ্রামের বাসিন্দা মাখন সিং। ১৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে কে বা কেউ তাকে ইট দিয়ে মেরে খুন করে। পরেরদিন সকালে শ্মশানের শেষকৃত্যস্থলের কাছে মাখনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ মৃতদেহটি হেফাজতে নিয়ে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে অজ্ঞাত খুনিদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করে। কিন্তু ২৪ ঘন্টা পরেও পুলিশ খুনিদের ধরতে ব্যর্থ হলে তখন পরিবার এবং গ্রামবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে মৃতদেহটি একটি ই-রিকশায় করে গ্রামের প্রধান সড়কে নিয়ে আসে এবং রাস্তা অবরোধ করে।
পাশাপাশি, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর আমেঠি পুলিশের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল এই ঘটনা সংক্রান্ত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতেও এই একই তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, মৃত মনোজ সিং ওরফে মাখন সিংয়ের খুনের ঘটনার পর তার পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়রা গৌরীগঞ্জ-জগদীশপুর প্রধান সড়ক অবরোধে চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মীরা যান চলাচল যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য তাদের বাধা দিয়েছিল। তবে পুলিশের তরফে তাদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করা হয়নি। পাশাপাশি, মাখন সিংয়ের খুনের ঘটনায় দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
লাইভ হিন্দুস্থানের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মনোজ অথভা মাখন সিংয়ের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ শিবলাল এবং ধর্মরাজ ওরফে দাদু নামক দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি, বিষয়টি সম্পর্কে আরও জানতে আমরা মৃত মনোজ সিং ওরফে মাখন সিংয়ের দাদা অজিত সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিও আমাদের এই একই তথ্য-সহ জানান, “প্রথমত, আমরা দলিত নই, বরং ক্ষত্রিয় (উচ্চবর্ণের মানুষ)। অন্যদিকে আমার ভাই মনোজ সিংয়ের খুনের অভিযুক্তরা সকলেই দলিত। দ্বিতীয়ত, ভাইরাল ভিডিওতে পুলিশ আমাদের মনোজের দেহ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করতে বাধা দিচ্ছে না। বরং পুলিশ আমাদের মৃতদেহ নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা থেকে আটকে ছিলেন।” জগদীশপুর থানার এসএইচও ডি কে যাদবও আজতক ফ্যাক্ট চেক এই একই তথ্য জানিয়েছেন।
এর থেকে প্রমাণ হয়, মিথ্যে জাতিগত বৈষম্যের সম্পর্ক জুড়ে ঝড়ানো হচ্ছে খুনের অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে মৃতদেহ নিয়ে বিক্ষোভের ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যে উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের চাপে পুলিশ একজন দলিত ব্যক্তির মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে দাহ করতে বাধা দিচ্ছে।
ভিডিওটির সঙ্গে বর্ণ বৈষম্যের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং এটি উত্তর প্রদেশের জগদীশপুরে খুনের অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে নিহত ব্যক্তির দেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের রাস্তা অবরোধের চেষ্টার সময় পুলিশের হস্তক্ষেপের দৃশ্য।