
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দুই ব্যক্তিকে বাঁশের খাটিয়ায় বেঁধে কাঁধে করে একজনের মৃতদেহ নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, বিজেপি শাসিত বিহারের একটি গ্রামে উচ্চবর্ণের লোকেদের তরফে এক দলিত মহিলার সৎকারে অংশ না নেওয়ার ফতোয়া জারি করা হয়। তখন নিতান্তই বাধ্য হয়ে ওই মহিলার বাবা ও ভাই নিজেরা দেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “ধন্য মানুষের মনুষ্যত্ব। বিহার প্রদেশে একটি গ্রামে এমন ফতোয়া জারি করেছে গ্রামের উচ্চ সম্প্রদায়ের লোকেরা-" এই মৃতার মহিলার শব যেন কেন না তোলে। শেষে ডোমেইন ডেকে এই ভাবে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। উঃ আর কতো নিচে নামবে ভারত?” পাশাপাশি, ভিডিও-র ফ্রেমের উপরে লেখা হয়েছে, “মধ্যযুগিয় বর্বরতার ফিরে এসেছে ভারতে। ছিঃ ধন্য বিজেপি ধন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ধন্য মনু ঋষি ধন্য মনুষ্যত্ব। গ্রামের বিধান এই মহিলার শব যেন কেউ না তোলে।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি বিহার কিংবা কোনও বিজেপি শাসিত রাজ্যের নয়। বরং এটি ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি হেমন্ত সোরেনের জেএমএম ও কংগ্রেস জোট শাসিত ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার দেওরি ব্লকের দুলাউরি গ্রামের ঘটনা। দ্বিতীয়ত, এই ভিডিও-র সঙ্গে জাতিগত বৈষম্যের কোনও সম্পর্ক নেই।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ভাইরাল ভিডিও-র একাধিক স্ক্রিনশট-সহ জি নিউজ-সহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তবে কোনও প্রতিবেদনেই ভিডিওটি কবে এবং কোথায় তোলা হয়েছিল সেই সংক্রান্ত তেমন কোনও তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
তবে এই সংক্রান্ত আরও অনুসন্ধান চালালে ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পাওয়া যায়। ভিডিও-র ক্যাপশন এবং ব্যাকগ্রাউন্ডের কণ্ঠস্বর অনুযায়ী, সেটি ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার দেওরি ব্লকের ঘটনা। পাশাপশি, একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও এই একই ভিডিও শেয়ার করে সেটিকে গিরিডির ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে আমরা আজতকের গিরিডি জেলার সাংবাদিক সুরজ সিনহার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, ভিডিওটি ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি গিরিডি জেলার দেওরি ব্লকের দুলাউরি গ্রামের ঘটনা। এবং মৃতদেহটি স্থানীয় মৃত বিনোদ রবিদাসের স্ত্রী পিঙ্কি দেবীর। এরপর আজতক ফ্যাক্ট চেকের তরফে দেওরির বিডিও কুমার বানহু কাশ্যপ এবং স্থানীয় ভেলওয়াঘাটি থানার এসএইচও ব্রজেশ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা উভয়ই নিশ্চিত করেন, ভিডিও-র সঙ্গে জাতিগত বৈষম্যের কোনও সম্পর্ক নেই।
বিডিও কুমার বানহু কাশ্যপ জানান, “দুলাউরি গ্রামের মৃত বিনোদ রবিদাসের স্ত্রী পিঙ্কি দেবী দীর্ঘদিন আসুস্থতার কারণে বিগত ৬ মাস ধরে তার বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। এরই মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি তার মৃত্যু হলে তার বাবা ও ভাই-সহ গ্রামের কয়েকজন সদস্য সৎকারের জন্য তার দেহ বাবার বাড়ি থেকে দুলাউরি গ্রামে তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে আসে। সেই সময় মৃতার স্বামীর বাড়ির সদস্যরা কাজের জন্য বাড়ির বাইরে ছিল। এমতো অবস্থায় পিঙ্কি দেবীর বাবার বাড়ির এক সদস্য ডেড সার্টিফিকেট বানানোর প্রমাণ স্বরূপ একটি ভিডিও বানানোর জন্য তার বাবা ও ভাইকে পিঙ্কির দেহ তুলে নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতে বলে। তবে তারপর তারা বাড়ির পুরুষ সদস্যদের বাড়িতে ফিরে আসার জন্য সেখানেই অপেক্ষা করে এবং ওইদিন সন্ধ্যায় সকলে মিলে দেহের সৎকার করে।”
বিডিও আরও জানান, “পরবর্তীতে সেই ভিডিও-র সঙ্গে মিথ্যে জাতিগত বৈষম্যের সম্পর্ক জুড়ে অনেকে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। দুলাউরি গ্রামে মূলত নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করেন। ওই গ্রাম এবং তার আসেপাশের এলাকায় কোনও উচ্চবর্ণের মানুষদের বসতি নেই।” পাশাপাশি, এরপর আমরা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে স্থানীয় চাহাল পঞ্চায়েতের প্রধান সামসুনিয়া খাতুনের ছেলে তথা সমাজ সেবক আরিফ রাজার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিও আমাদের এই একই তথ্য প্রদান করে জানান, “আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পিঙ্কি দেবীর সৎকারের জন্য তার পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা সাহয্য করেছি। পাশাপাশি, তার সৎকারে তার স্বামীর বাড়ির পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের অন্যান্য মানুষও অংশ নিয়েছিলেন।”
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, বিহারের জাতিগত বৈষম্যের ঘটনা দাবিতে ভাইরাল ঝাড়খণ্ডের গিরিডি অসম্পর্কিত ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি শাসিত বিহারের একটি গ্রামে উচ্চবর্ণের লোকেদের তরফে এক দলিত মহিলার সৎকারে অংশ না নেওয়ার ফতোয়া জারি করার জেরে ওই মহিলার বাবা ও ভাই বাধ্য হয়ে নিজেদেক কাঁধে করে দেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যায়।
ভিডিওটি বিহার কিংবা কোনও বিজেপি শাসিত রাজ্যের নয়। বরং এটি জেএমএম ও কংগ্রেস জোট শাসিত ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার দেওরি ব্লকের দুলাউরি গ্রামের ঘটনা। পাশাপাশি, এই ভিডিও-র সঙ্গে জাতিগত বৈষম্যের কোনও সম্পর্ক নেই।