
সাম্প্রতিক সময়ে ওড়িশা এবং অসম-সহ একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্য বাংলাদেশি সন্দেহে মুসলিম শ্রমিকদের হেনস্থা অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে অসমে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের নামে ‘কেবলমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে’ বলে দাবি করা হয়েছে স্থানীয়দের তরফে। আর এই সব হেনস্থার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরব হয়েছেন সংখ্যালঘু মুসলিমরা। এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে দুটি ভিডিও।
যেখানে প্রথম ভিডিওতে, প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে সাদা পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে লাঠি দিয়ে মারধর করছে বেশকিছু পুলিশ কর্মী। ক্লিপটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার জন্য একজন মুসলিম ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর করছে বিজেপি সরকারের পুলিশ। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ভারতে মুসলমানদের উপর চলছে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন! হে আল্লাহ আপনি জালিম সাশক **** মোদী হাত থেকে মুসলমানদের হেফাজত করেন।”
অন্যদিকে দ্বিতীয় ভিডিওতে, বেশকিছু উত্তেজিত যুবককে একটি মসজিদের গেটের সামনে জড়ো হয়ে গেটে লাথি মারতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে মসজিদের উপর থেকে একজন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি হাতে লাঠি নিয়ে এক পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় ক্লিপটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তরফে একটি মসজিদে হামলা চালানো হলে একজন বিশেষভাবে সক্ষম মুসলিম ব্যক্তি একাই তাদের প্রতিহত করেছে। ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ভারতে মসজিদে হা**মলা করে কিছু হায়নার দল সেখানে একটা লাঠি আর এক পায়ের উপর দারিয়ে লরাই করেছিলো এক সিংহ মুসলিম যুবক।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, প্রথম ক্লিপটি ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে তিরুবনন্তপুরমের ঘটনা এবং এতে পুলিশের দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিটি মুসলিম নয় বরং তিনি কেরলের এনএসইউআই (কেএসইউ) সভাপতি কে এম অভিজিৎ। অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটি ভারতের নয় বরং সেটি নেপালের ঘটনা।
সত্য উন্মোচন
প্রথম ভিডিও: ভাইরাল প্রথম ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশন অনুযায়ী, ভিডিওতে পুলিশের হাতে আক্রান্ত ব্যক্তিটি মুসলিম নয় বরং তিনি কেরল প্রদেশ এনএসইউআই সভাপতি কে এম অভিজিৎ। একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় কেরল পুলিশ তাঁকে-সহ অন্যান্য কর্মীদের নির্মমভাবে মারধর করে।
এরপর এই সংক্রান্ত পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেরল বিশ্ববিদ্যালয়ে নম্বর জালিয়ার তদন্তের দাবিতে ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর তিরুবনন্তপুরমে এনএসইউআই (কেএসইউ) তরফে একটি বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। বিক্ষোভের এক পর্যয়ে বিক্ষোভকারীদের উপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে আক্রান্ত হন এনএসইউআই (কেএসইউ) সভাপতি কে এম অভিজিৎ এবং বিধায়ক শফি পারম্বিল-সহ একাধিক কর্মী।
দ্বিতীয় ভিডিও: এরপর দ্বিতীয় ক্লিপটির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্যম TRT World-এর অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। নেপালের রাউতাহাট জেলায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা স্থানীয় একটি মসজিদে হামলা চালালে এক পা বিশিষ্ট একজন মুসলিম ব্যক্তি তাদের হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এরপর উক্ত তথ্যের উপরে ভিত্তি করে পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম দৈনিক ইনকিলাবে ভাইরাল ভিডিও-র একাধিক স্ক্রিনশট-সহ এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানেও এই একই তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, ভিডিওটি নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা রাউতাহাটের রামপুর খাপ এলাকার ঘটনা।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, ভারতে মুসলিমদের উপরে পুলিশ এবং হিন্দুত্ববাদীরা হামলা করেছে দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে নেপালে অসম্পর্কিত এবং কেরলের পুরনো ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার জন্য একজন মুসলিম ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর করছে বিজেপি সরকারের পুলিশ।
প্রথম ক্লিপটিতে পুলিশের হাতে আক্রান্ত ব্যক্তিটি মুসলিম নয় বরং তিনি কেরলের এনএসইউআই (কেএসইউ) সভাপতি কে এম অভিজিৎ। অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটি ভারতের নয় বরং সেটি নেপালের ঘটনা।