
আর মাত্র কয়েকমাস মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে বিজেপি ছেড়ে নেতা-কর্মীদের তৃণমূলে যোগদানের তিনটি ভিন্ন নিউজ ক্লিপ। প্রতিটি ক্লিপই শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপরে রাগ করে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে দলের জেলা সম্পাদক, জেলা স্তরের নেতা এবং পয়াঞ্চায়েত সদস্য-সহ কয়েক হাজর কর্মী।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর তরফে শেয়ার করা নিউজ-১৮ বাংলার প্রথম ক্লিপটিতে উপস্থাপককে বলতে শোনা যাচ্ছে, আসানসোলে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে দলের জেলা সম্পাদক এবং ৩৮ জন নেতা-সহ মোট ৩ হাজার কর্মী। ক্লিপটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “শুভেন্দু অধিকারীর ওপর ক্ষোভ উগরে আসানসোলে বিজেপির জেলা সম্পাদক বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করলো।”
ওই একই ব্যক্তি নিউজ-১৮ বাংলার অন্য একটি ক্লিপ শেয়ার করেছেন। ক্লিপ অনুযায়ী, কোচবিহারের তুফানগঞ্জ -১ নম্বর ব্লকের অন্দরান ফুলবাড়ি -১ নম্বর পঞ্চায়েতের ৪ জন বিজেপি পঞ্চায়েত সদস্যকে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। ক্লিপটি শেয়ার করে তিনি প্রায় একই রকম দাবি করে লিখেছেন, “শুভেন্দু অধিকারীর ওপর ক্ষোভ উগরে কোচবিহারে গ্রাম পঞ্চায়েত হাত ছাড়া বিজেপির চারজন বিজেপির পঞ্চায়েত মেম্বার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করলো এর ফলে বোর্ড গঠন করলো তৃণমূল কংগ্রেস।”
অন্যদিকে তৃতীয় ক্লিপে এবিপি আনন্দের একটি সংবাদ প্রতিবেদন শেয়ার করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোচবিহারের নাটাবাড়ির বলরামপুরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে ৪২টি পরিবার। ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “শুভেন্দু অধিকারীর ওপর ক্ষোভ উগরে কোচবিহারে নাটাবাড়ি বিধানসভায় ৪২ টি পরিবার বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করলো।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল নিউজ ক্লিপগুলির একটিও সাম্প্রতিক নয় এবং এগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে ভাঙনের কোনও সম্পর্ক নেই। আসলে নিউজ-১৮ বাংলার প্রথম ক্লিপটি ২০২১ সালের ২৭ জুনের, দ্বিতীয় ক্লিপটি ২০২৪ সালের ৭ জুলাইয়ের এবং এবিপি আনন্দের তৃতীয় ক্লিপটি ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারির।
সত্য উন্মোচন
প্রথম ক্লিপ: নিউজ-১৮ বাংলার প্রথম ক্লিপটির সত্যতা জানতে এই সংক্রান্ত একাধিক কিওয়ার্ড সার্চ এবং ভিডিওটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন, ২০২১ সালের ২৭ জুন নিউজ-১৮ বাংলার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই একই ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটি শেয়ার করে সেখানে লেখা হয়েছে, “আসানসোলে বিজেপিতে ভাঙন। তৃণমূলে যোগ দিলেন আসানসোলের ৩৮ BJP নেতা। আসানসোলের বিজেপির জেলা সম্পাদকের তৃণমূলে যোগ। আসানসোলের প্রায় ৩ হাজার বিজেপি কর্মীরও তৃণমূলে যোগ।” সেই সময় টিভি-৯ বাংলা-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যা থেকে স্পষ্ট হয় ভিডিও সাম্প্রতিক নয় বরং ২০২১ সালের ঘটনা।
দ্বিতীয় ক্লিপ: এরপর নিউজ-১৮ বাংলার দ্বিতীয় ক্লিপটি নিয়ে অনুসন্ধান চালালে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই চ্যানেলটির অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম এবং বিস্তারিত অংশে লেখা হয়েছে, “কোচবিহারে ফের একটি গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করলো তৃণমূল। এবার তুফানগঞ্জ -১ নম্বর ব্লকের অন্দরান ফুলবাড়ি -১ নম্বর পঞ্চায়েতে ফুলবদল। শনিবার রাতে গ্রাম পঞ্চায়েতের চার সদস্য বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট আসন ১২ টি। বিজেপি-র ১০ এবং তৃণমূলের ২ টি আসন ছিল। লোকসভা ভোটের পর একজন বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগ গেন। এবার আরও চারজনের দল বদল। এর ফলে ওই পঞ্চায়েত চলে গেল তৃণমূলের হাতে।” সেই সময় এবিপি আনন্দ-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যা থেকে স্পষ্ট হয় ভিডিও সাম্প্রতিক নয় বরং ২০২৪ সালের ঘটনা।
তৃতীয় ক্লিপ: সব শেষে এবিপি আনন্দের প্রতিবেদন অর্থাৎ তৃতীয় নিউজ ক্লিপটি নিয়ে অনুসন্ধান চালালে ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি এবিপি আনন্দের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই একই ভিডিও-র বর্ধিত সংস্করণ-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “এ বার ভাঙন BJP তে। ৪২ টি পরিবার হাত ধরল TMC র।” পাশাপাশি, প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, কোচবিহারের নাটাবাড়ি ব্লকের বলরামপুরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেয় ৪২টি পরিবার। তাদের হাতে তৃণমূলের দলীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। মন্ত্রী দাবি করেন, বিজেপি-র প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে এই পরিবারগুোল তৃণমূলে যোগদান করেছিল।
সব মিলিয়ে প্রামণ হয়ে যায় যে, পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে ভাঙন দাবি করে শেয়ার করা হচ্ছে পুরনো সব নিউজ ক্লিপ।
নিউজ ক্লিপগুলিতে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুভেন্দু অধিকারীর উপরে রাগ করে সম্প্রতি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে দলের জেলা সম্পাদক এবং পয়াঞ্চায়েত সদস্য-সহ কয়েক হাজর কর্মী।
ভাইরাল নিউজ ক্লিপগুলির একটিও সাম্প্রতিক নয় এবং এগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে ভাঙনের কোনও সম্পর্ক নেই।