
প্রতিদিন গোটা বিশ্বে বহু মানুষ বিভিন্ন কারণে শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। কেউ জন্মান হাতে বা পায়ে অতিরিক্ত আঙুল নিয়ে আবার কারোর জন্ম হয় হাত-পা ছাড়াই। অনেকেই এই বিশেষ সক্ষমতাকে অলৌকিকতা বা ঈশ্বরের আর্শীর্বাদ মনে করেন। আবার কেউ কেউ অভিশাপ বা শয়তানের কার্যকলাপ বলে থাকেন।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এমনই এক ব্যক্তির ছবি। যেখানে দেখা যাচ্ছে ওই ব্যক্তির সামনে ও পিছনে রয়েছে দুটি মুখ। ভাইরাল এই ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, দু-মুখ বিশিষ্ট ওই ব্যক্তির নাম হল এডওয়ার্ড মরড্রের্ক। তার জন্ম ঊনবিংশ শতাব্দীতে। এবং তিনি মানসিক বিপর্যয়ের কারণে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আত্নঘাতী হন।
উদাহরণস্বরূপ, গত ৮ মার্চ এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, “এই ব্যাক্তিকে চেনেন? এই ব্যাক্তির নাম এডওয়ার্ড মরড্রের্ক,যিনি ১৯ শতকে পৃথিবীর মুখ দেখেছিলেন। কিন্তু সবার মতো তার মুখ একটি ছিলোনা,বরং উভয় দিকে মাথার সামনে ও পিছনের দিকে ছিলো।তাঁর মুখ ছিলো দুইটি, ওনার ধারণা ছিলো তার অন্য মুখটি ছিলো শয়তানের মুখ। কারন,সেটি নাকি রাতের বেলায় ঘুমোতে দিতো না,কানের কাছে ফিস ফিস করতো। তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলোনা সে মুখের উপর। অনেক সুত্র অনুযায়ী, অবাঞ্ছিত মুখটি খাওয়া দাওয়া করতে পারতো না। এডওয়ার্ড যখন খুশি থাকতেন,তখন অন্য মুখটি নাকি কাঁদতো,আর তিনি যখন কাঁদতেন তখন অন্যটি আনন্দে হাসতো।। তার মানে আবেগ অনুভুতি সম্পুর্ন বিপরীত। =>কি মারাত্মক তাই না?? এতে তিনি অতিষ্ট হয়ে অনেক ডাক্টারকে অস্ত্র পচার করে তার অন্য মাথাটি কেটে ফেলার অনুরোধ করেন, কিন্তুু কেউ সাহস করেনি। সব শেষ তিনি প্রচন্ড ডিপ্রেশনে ভুগে মাত্র ২৩-বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন।।” (ক্যাপশনের সব বানান অপরিবর্তিত)
একই দাবি সহ ছবিটি পোস্ট করেছেন আরও অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী। সেই সব পোস্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে এডওয়ার্ড মরড্রের্ক বাস্তব জগতের কোনও দুমুখো মানুষ নয়। বরং এটি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
কীভাবে জানা গেল সত্য?
এডওয়ার্ড মরড্রের্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে ইন্ডিয়া টুডের তরফে বিভিন্ন কিওয়ার্ড ও রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। কিন্তু সেই সার্চে আমাদের হাতে এমন কোনও নির্ভারযোগ্য তথ্য উঠে আসেনি যা থেকে অনুমান করা যায় যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এডওয়ার্ড মরড্রের্ক নামক সত্যিই কোনও দুমুখো মানুষ পৃথিবীতে ছিলেন।
তবে কিওয়ার্ড ও রিভার্স ইমেজ সার্চ করার সময় আমরা দেখতে পাই ১৮৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বর আমেরিকান লেখক চার্লস লটিন হিলড্রেক ‘এডওয়ার্ড মরড্রেকট’ নামক চরিত্রটিকে নিয়ে ‘The Boston Sunday Post’ পত্রিকার ২০ নম্বর পৃষ্ঠায় একটি কাল্পনিক গল্প প্রকাশ করেন।
পাশাপাশি পরবর্তীতে ১৮৯৬ সালে দুই ডাক্তার George M. Goulad ও Walter L. Pyle তরফে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপরে প্রকাশিত “Anomalies and Curiosity of Medicine” বইটিতেও মরড্রেক চরিত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সেটিও হিলড্রেকের প্রকাশিত সেই কাল্পনিক গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর এই বই প্রকাশের পরপরই এডওয়ার্ড মরড্রের্কের কাল্পনিক গল্পটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে থাকে।
আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি এডওয়ার্ড মরড্রের্কের নামে যে ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হচ্ছে সেগুলি আসলে মোমের তৈরি। যা জার্মানির হ্যামবার্গ শহরে অবস্থিত প্যানোপটিকম জাদুঘরে রয়েছে।
সেই জাদুঘরের অন্দরে থাকা ভাস্কর্যগুলির একটি ভিডিও এখানে দেখা যাবে। সেই ভিডিওতে চর্চিত এই ভাস্কর্যটি দেখা যাবে।
এর থেকেই প্রমাণ হয় যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে দুই মুখ বিশিষ্ট এডওয়ার্ড মরড্রেক নামক কোনও ব্যক্তি বাস্তবে ছিলেন না।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে এডওয়ার্ড মরড্রের্ক নামক দুটি মুখ বিশিষ্ট এক ব্য়ক্তি ছিলেন। ডাক্তাররা তার একটি মুখ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দেওয়ার অনুরোধ না শোনায় মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করেন।
এডওয়ার্ড মরড্রের্ক বাস্তব জগতের কোনও দুমুখো মানুষ নয়। বরং এটি ১৮৯৫ সালে আমেরিকান লেখক চার্লস লটিন হিলড্রেকের তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র।