
গণঅভ্যুত্থানের কারণে গত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর থেকেই দেশটি ঘটে চলছে একের পর সহিংসতার ঘটনা। কেবলমাত্র আওয়ামী লীগ নেতা বা কর্মীরা নয়। দুষ্কৃতীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু হিন্দুরাও।
আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে জেসিবির সাহায্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি উচ্ছেদের একটি ভিডিও। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি ছাত্র আন্দোলনের নাম করে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “কবি গুরুর সম্মান হয় না যেখানে। সেখানে আর যাই হোক ছাত্র আন্দোলন হতে পারে না। বাংলাদেশে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে রবি ঠাকুরের মূর্তি ছি! ছি! লজ্জা।। আমরা আজ লজ্জিত কবিশ্রেষ্ঠ ক্ষমা করো।” (সব বানান অপরিবর্তিত।) এমনই একটি পোস্টের আর্কাইভ এখানে দেখা যাবে।
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। বরং সেটি গত ৩ আগস্ট বোলপুর পৌরসভার উদ্যোগে শান্তিনিকেতনের কবিগুরু হস্তশিল্প মার্কেট থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি অন্যত্র সরানোর দৃশ্য।
কীভাবে জানা গেল সত্য?
প্রথমত, ভাইরাল ভিডিওটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই, যে জেসিবি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তিটি তোলা হচ্ছে তাতে লাগানো নম্বর (WB48F2517) প্লেটটি পশ্চিমবঙ্গের। এরপর সেই নম্বরটি নিয়ে পরিবহন দপ্তরের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করলে আমরা জানতে পারি জেসিবিটি বোলপুর পৌরসভার নামে নথিভুক্ত।
এরপর আমরা এই সংক্রান্ত একাধিক কিওয়ার্ড সার্চ করলে গত ৮ আগস্ট এই একই ভিডিও অপর এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রোফাইলেও দেখতে পাই। তার কমেন্ট সেকশনে দু’জন উল্লেখ করেছেন, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনের। এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তিটি তোলা হয়েছে বোলপুর পৌরসভার তরফে।
উপরে উক্ত তথ্যের উপরে ভিত্তি করে পুনরায় সার্চ কারলে আমরা গত ৪ আগস্ট রবি ঠাকুরের এই একই মূর্তির ছবি-সহ আনন্দবাজার অনলাইনে একটি প্রতিবেদন দেখতে পাই। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “শান্তিনিকেতনের কবিগুরু হস্তশিল্প মার্কেটে সরাতে জেলাশাসককে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বিশ্বভারতী। একই সঙ্গে হস্তশিল্প মার্কেটে বোলপুর পুরসভার পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি বসানো নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিশ্বভারতী। শনিবার পুরসভার উদ্যোগেই সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হল কবি-মূর্তি।”
এরপর গত ৩ আগস্ট ইটিভি ভারত বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকেও আমরা এই একই তথ্য জানতে পারি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “বিশ্বভারতীর হেরিটেজ বাফারজোন থেকে ক্রেন দিয়ে উপড়ে ফেলা হল রবীন্দ্রমূর্তি ! বিশ্বভারতীর চত্বর থেকে সরল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ৷ বিশ্বভারতীর আপত্তিতেই বোলপুর পুরসভা এই মূর্তি সরিয়েছে বলে খবর ৷”
এরপর আমরা গত ২৮ জুলাই বিশ্বভারতীর বাফার জোনে বোলপুর পৌরসভার তরফে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি বসানো সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে নিউজ-১৮-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে একটি ভিডিও প্রতিবেদন খুঁজে পাই। সেই ভিডিও প্রতিবেদনের ব্যাকগ্রাউন্ডের ফ্রেমের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর ফ্রেমের তুলনা করলে আমরা উভয়ের মধ্যে হুবহু মিল দেখতে পাই। নিচে উভয় ভিডিও ফ্রেমের তুলনা দেখা যাবে।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি সরানোর দৃশ্যকে বাংলাদেশের দাবি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
ভাইরাল ভিডিয়োটি বাংলাদেশের নয়। বরং সেটি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি অন্যত্র সরানোর দৃশ্য।