
দিনকয়েক স্বামী বিবেকানন্দের ইডেনে বল করার একটি ছবি হইচই ফেলে দিয়েছিল নেট মাধ্যমে। যদিও ক'দিন পর জানা যায় সেটা ছিল সম্পাদিত। তবে এ বার মা সারদার একটি ছবি নেট মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যা বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছে। বেশ কয়েকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মা সারদার একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করছেন। ছবিটিতে লেখা রয়েছে, "দুর্লভ ছবি। পুরীর মন্দিরে মা সারদা।"
ভাইরাল ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সত্যিই পুরী মন্দিরের সমুখে হাতে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের একটি ছবি নিয়ে মা সারদা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আশেপাশে অন্যান্য ভক্তদেরও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত পোস্টটি প্রায় ৩৫০ বার শেয়ার করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া-টুডের অ্যান্টি ফেক নিউজ ওয়ার রুম (আফয়া) তদন্ত করে পেয়েছে যে, ভাইরাল হওয়া ছবিটি সম্পূর্ণ ভুয়ো। মা সারদা দু'বার পুরী গিয়েছিলেন এ কথা সত্যি। কিন্তু এই ছবিটি ফটোশোপের মাধ্যমে দু'টি পৃথক ছবিতে একত্রে এনে তৈরি করা হয়েছে।
আফয়া তদন্ত
ভাইরাল হওয়া ছবিতে বেশ কয়েকটি জিনিস দেখে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক ছিল। প্রথমত, মা সারদা হাত দিয়ে যেভাবে রামকৃষ্ণ দেবের একটি ধরে ছিলেন, তা স্বাভাবিক নয়। লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, হাত দিয়ে ছবিটি ধরে থাকার ভঙ্গিতে একটি অস্বাভাবিকত্ব রয়েছে। সেই সঙ্গে, মায়ের পোশাকের রঙের সঙ্গে পাশে থাকা ব্যক্তির পোশাকের ঔজ্বলতা ছিলও ভিন্ন। সেই কারণে এর রসহ্য সমাধানে আমরা প্রথমেই ভাইরাল ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ করি।
রিভার্স সার্চের দরুণ প্রথমে চোটেই একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যা যে ছবিটিতে কারসাজি করা হয়েছে। কারণ, সার্চের ফলাফল থেকে আমরা আউটলুকে প্রকাশ পাওয়া একটি ছবির গ্যালারি খুঁজে পাই। গ্যালারিতে ১৯১০ সালে ব্রিটিশ রাজে তোলা ভারতের কিছু বিখ্যাত স্থানের ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনেই লেখা হয়, অজানা এই ছবিগুলি সম্প্রতি এডিনবার্গ থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে। স্কটল্যান্ডের রয়্যাল কমিশন অব অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল মনুমেন্টসের তত্ত্বাবধানে ছবিগুলি প্রকাশ পায়। সেখানেই আমারা ভাইরাল ছবিটির হুবহু ছবির সন্ধান পাই।
আসল ছবিটির সঙ্গে ভাইরাল ছবিটির তুলনামূলক বিচার করতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ছবি দুটি আসলে একই। তবে আসল ছবিতে মা সারদার উপস্থিতি ছিল না। ফলে আরও একটা জিনিস বোঝা যায়, মা সারদার ছবিটি ফটোশপের মাধ্যমে সেখানে যোগ করা হয়েছে।
মা সারদার ছবিটি কি আসল?
হ্যাঁ। মা সারদার ছবিটি যে আসল এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সেটি প্রমাণ করতে এর উৎস সন্ধানে এবার মায়ের ছবিটি আমরা রিভার্স সার্চ করি। তখন বেলুড় মঠের প্রকাশনা সংস্থা অদ্বৈত আশ্রমের ওয়েবসাইটে ওই ছবিটি বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে, এমনটা আমাদের নজরে পড়ে। সারদা মায়ের সেই ছবির সঙ্গে তাঁর হাত ও দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি পুরোপুরি মিলে যায়। কিন্তু সেখানে হাতে রামকৃষ্ণ দেবের ছবি ছিল না। ফলে সে ক্ষেত্রেও যে প্রযুক্তিগত কারুকার্য করা হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
ছবিটি কবে বা কখন তোলা, তার ইঙ্গিত রিভার্স সার্চের মাধ্যমেই একটি ফেসবুক পেজ থেকে আমরা পাই। সারদা মা নামের একটি পেজ থেকে ২০১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মায়ের আসল ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল। তার নীচে যে ছবি সম্পর্কে থাকা সংক্ষিপ্ত বিবরণ অনুসরণ করে আমরা কি-ওয়ার্ড সার্চ করি।
কি-ওয়ার্ড সাচের ফলে ইন্ডিয়া ডকুমেন্টস নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে আসল ছবিটির সন্ধান পাওয়া যায়। যেখানে উল্লেখ পায়, ১৯১৮ সালে ব্রক্ষ্মচারী জ্ঞানেন্দ্রনাথ এই ছবিটি তুলেছিলেন। ছবিতে সারদা মায়ের পাশে মাকু এবং তাঁর ছেলে নেড়াকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বলে সেখানে লেখা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আজতক বাংলার পক্ষ থেকে সারদা মায়ের আশ্রম জয়রামবাটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।আশ্রম কর্তৃপক্ষের তরফে স্বামী প্রবুদ্ধানন্দজি মহারাজ আজতক বাংলাকে নিশ্চিত করেন যে ছবিটি সেখানেই তোলা।
মা সারদা কি পুরী গিয়েছিলেন?
তবে মা সারদা সত্যিই পুরী গিয়েছিলেন কিনা এই নিয়ে জানতে আমরা বেশ কিছু কিওয়ার্ড সার্চ করি এবং বেলুড় কর্তৃক প্রকাশিত এক ম্যাগাজিন খুঁজে পাই। 'শ্রী রামকৃষ্ণ অ্যান্ড হিজ ডিসেপল ইন ওড়িষা' শীর্ষক ম্যাগাজিনের ২৩ নম্বর পাতায়, সারদা মায়ের ওড়িশা ভ্রমণের অধ্যায়ে সেই বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে লেখা হয়, ১৮৮৮ সালে একবার ও ১৯০৪ সালে সারদা পুরী মন্দিরে যান। এরপর ১৯১০ সালেও তিনি একবার ওড়িশা গিয়েছিলেন, তবে সেবার পুরী না গিয়েই ফিরে এসেছিলেন।
সুতরাং, এ কথা বলাই যায় যে সারদা মায়ের যে ছবিটি কে পুরী মন্দিরে তাঁর দুর্লভ ছবি বলে দাবি করা হচ্ছে, তা আসলে ফটোশপ করা।
.
এটি পুরীতে মন্দিরে তোলা মা সারদার দুর্লভ ছবি।
ভাইরাল ছবিটি ফটোশপ করা হয়েছে। মা সারদার হাতে রামকৃষ্ণদেবের ছবিটিও এডিট করে বসানো হয়েছে। মা সারদার আসল ছবিটি ১৯১৮ সালে তোলা। জয়রামবাটিতে ব্রক্ষ্মচারী জ্ঞানেন্দ্রনাথ ছবিটি তোলেন। অন্যদিকে, পুরী মন্দিরের আসল ছবিটি ১৯১০-১২ সাল নাগাদ তোলা। সম্প্রতি সেটি এডিনবার্গে উদ্ধার হয়েছে।