সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে রাস্তার পাশে অবস্থিত একটি ছোট মন্দির বা দরগাহ জাতীয় ঘরের সামনে অবস্থিত গাছ থেকে একটি ত্রিপল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যাচ্ছে এক ব্যক্তিকে। পাশাপাশির গাছের উপরে এবং পাশে পড়ে রয়েছে কাঠের তৈরি একাধিক ফলের খালি ট্রে।
ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে আলিগড়ের মীনাক্ষী সেতুর নিচে অবস্থিত একটি ভৈরব বাবার মন্দির সম্পূর্ণ দখল করে তার সামনে ফলের দোকান দিয়েছিল মুসলিমরা। আলিগড় পৌর নিগমের তরফে চালানো অভিযানের সময় মন্দিরটি নতুন করে আবিষ্কার হয়েছে বা সামনে এসেছে।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “গতকাল আলিগড়ের মীনাক্ষী সেতুর নিচে একটি ফলের দোকানের পিছন থেকে আবিষ্কার হলো ভৈরব বাবার মন্দির। আলিগড় পৌর নিগমের তরফে মন্দিরটিকে দখল মুক্ত করা হয়েছে। জেহাদীরা মন্দিরের সামনে ফলের দোকান দিয়ে বহুদিন ধরে মন্দিরটিকে ঢেকে রেখেছিল।” (সব বানান অপরিবর্তিত)
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওতে ভৈরব বাবার মন্দির দখল করে কোনও ফলের দোকান দেওয়া হয়নি। বরং মন্দিরের সামনে অবস্থিত একটি নিম গাছের সামনে এই দোকানটি দেওয়া হয়েছিল এবং দোকানের পাশ দিয়ে মন্দিরে যাওয়ার জন্য একটি পথ রয়েছে। অন্যদিকে এই ফলের দোকানের মালিক কোনও মুসলিম ব্যক্তি নয়। বরং তারা দু’জনেই হিন্দু এবং সম্পর্কে বাবা ও ছেলে।
সত্য উন্মোচন হলো যেভাবে
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে এই সংক্রান্ত একাধিক কিওয়ার্ড সার্চ করলে ২০২৫ সালের ২৯ অগস্ট লাইভ হিন্দুস্তানে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৮ অগস্ট অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার আলিগড় পৌর নিগমের তরফে সুতমিল এবং মীনাক্ষী সেতুর নীচ থেকে গুরুদ্বার রোড পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশ থেকে অবৈধ দখল অপসারণ করা হয়। পাশাপাশি অবৈধভাবে রাস্তা দখল করে তৈরি করা একাধিক দোকান ভেঙে দেওয়া হয়। মূলত, শহরের মসৃণ যান চলাচল ব্যবস্থা, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতেই এই অভিযান চালানো হয়।
এরপর উক্ত তথ্যের উপরে ভিত্তিক করে এই সংক্রান্ত পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে গত ২৮ ও ২৯ আগস্ট Hindustan Tehelka News-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলে এই উচ্ছেদ অভিযান সংক্রান্ত ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা সেই সব প্রতিবেদনে ব্যবহৃত একাধিক ভিডিও ক্লিপের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেগুলি থেকে ভাইরাল ভিডিওর শুরুতেই ওই ফলের দোকান বা তথাকথিত মন্দিরের ডান পাশে থাকা মিষ্টির দোকান এবং সেটির উপরে লাগানো নীল রঙের ব্যানারটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যা থেকে জানা যায় ভাইরাল ভিডিওতে ওই ফলের দোকানের পাশে থাকা মিষ্টির দোকানটির নাম হল ‘নীলকন্ঠ সুইটস’
এরপর আমরা গুগল ম্যাপের স্ট্রিট ভিউতে ‘নীলকন্ঠ সুইটস’ এবং তার পাশে অবস্থিত ভাইরাল ভিডিওর তথাকথিত ভৈরব বাবার মন্দির ও ফলের দোকানটি খুঁজে বার করি। গুগুল ম্যাপে আমরা সদ্য পুরনো অর্থাৎ গত জুন মাসে তোলা ভাইরাল ফলের দোকানের একটি ছবি দেখতে পাই। সেই ছবিতে ওই ফলের দোকানের সামনে লাগানো ব্যানার থেকে জানা যায়, দোকানটির নাম ‘ডালচাঁদ রাজপুত ফ্রুট শপ’। যা থেকে অনুমান করা যায়, দোকানের মালিক কোনও মুসলিম ব্যক্তি নয় বরং তিনি হিন্দু হতে পারেন।
তবে ফলের দোকানে লাগানো ব্যানারে দোকানের মালিক এবং তার ফোন নম্বর দেওয়া থাকলেও তা স্পষ্ট নয়। তাই এরপর আমরা বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ‘ডালচাঁদ রাজপুত ফ্রুট শপ’এর ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক রাজ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “ওই ফলের দোকানের মালিক হলেন ডালচাঁদ রাজপুত ও তার ছেলে রবীন্দ্র কুমার রাজপুত। এবং তারা কেউই মুসলিম নয় বরং দু’জনেই হিন্দু।”
রাজ কুমার আরও জানান, “সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্দিরটি দখল করে ফলের দোকান দেওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ভৈরব বাবার মন্দির দখল করে কোনও ফলের দোকান দেওয়া হয়নি। মন্দিরটি বরাবরই সেখানে ছিল এবং তাতে প্রায়ই পূজাপাঠ হয়। আসলে ডালচাঁদ ও তার ছেলে রবীন্দ্র মন্দিরের সামনে অবস্থিত একটি নিম গাছের সামনে তাদের দোকানটি দেয়। এবং মন্দিরে যাওয়ার জন্য তাদের ফলের দোকান ও পাশে থাকা নীলকন্ঠ সুইটসের মাঝ বরাবর একটি সরু পথ রয়েছে। যা দিয়ে মন্দিরে যাওয়া হয়। এবং ডালচাঁদ ও তার ছেলে রবীন্দ্রই মন্দিরটি দেখাশোনা করেন। মন্দির দখল করার জন্য নয় বরং অবৈধভাবে রাস্তার উপরে দোকান দেওয়ার কারণেই গত ২৮ অগস্ট পৌর নিগমের তরফে তাদের দোকানটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।” এখানে উল্লেখ্য, আমরা গুগল ম্যাপে ডালচাঁদ রাজপুত ফ্রুট শপ ও তার পাশে থাকা নীলকন্ঠ সুইটসের মাঝ বরাবর মন্দিরে যাওয়ার জন্য একটি সরু পথও দেখতে পাই।
এরপর আমরা রাজ কুমারের মাধ্যমে ওই ফলের দোকানের মালিক রবীন্দ্র কুমার রাজপুতের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “আমার বাবা বিগত ৪০-৪৫ বছর ধরে এখানে ফলের দোকান দিচ্ছে। মন্দির দখল করে দোকান দেওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যে। এমনকি গত ২৮ অগস্টের অভিযানের পর নতুন করে মন্দিরটি আবিষ্কার হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে সেটিও মিথ্যে। কারণ বহু বছর থেকেই মন্দিরটি সেখানে রয়েছে এবং তাতে প্রায়ই পূজাপাঠ হয়। আমি এবং আমার বাবাই মন্দিরটি দেখাশোনা করি। এবং আমরা কোনও দিনই মন্দির দখল করে দোকান দিইনি। বরং মন্দিরের সামনে থাকা নিম গাছের সামনে আমরা আমাদের ফলের দোকান দিয়েছি। এবং মন্দিরে যাওয়ার জন্য আমাদের দোকানের পাশ দিয়ে একটি সরু পথ রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় মন্দিরের দৈর্ঘ্যের সমান।”
এরপর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আমরা আলিগড় পৌর নিগমের পিআরও আহসান রবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিও আমাদের এই একই তথ্য-সহ জানিয়েছেন, “মন্দির দখল করে ফলের দোকান দেওয়ার দাবিটি বিভ্রান্তিকর। মন্দির দখল করা হয়নি বরং মন্দিরের পাশে থাকা একটি নিম গাছের সামনে অবৈধভাবে রাস্তার উপরে দোকানটি দেওয়া হয়েছিল। পৌর নিগমের তরফে অবৈধভাবে দোকান দেওয়ার জন্যই সেটি ভেঙে দেওয়া হয়। পাশাপাশি দোকানের মালিক কোনও মুসলিম ব্যক্তি নয় বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।” অন্যদিকে আজ তকের আলিগড় জেলা সাংবাদিক মহম্মদ আক্রম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও আমাদের এই একই তথ্য প্রদান করেন।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, আলিগড়ে মুসলিমদের তরফে হিন্দু মন্দির দখল করে ফলের দোকান দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যে ও বিভ্রান্তিকর।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আলিগড়ের মীনাক্ষী সেতুর নিচে অবস্থিত একটি ভৈরব বাবার মন্দির সম্পূর্ণ দখল করে তার সামনে ফলের দোকান দিয়েছিল মুসলিমরা। সাম্প্রতিক পৌর নিগমের অভিযানে মন্দিরটি নতুন করে আবিষ্কার হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিওতে ভৈরব বাবার মন্দির দখল করে কোনও ফলের দোকান দেওয়া হয়নি। বরং মন্দিরের সামনে অবস্থিত একটি নিম গাছের সামনে এই দোকানটি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে দোকানের মালিক কোনও মুসলিম নয় বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।