
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে কোনও একটি রেলওয়ে ব্রিজের নিচে একটি স্যুটকেসের ভিতরে এক মহিলার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে দেহটিকে ঘিরে রয়েছেন বেশকিছু পুলিশ কর্মী। এবং পুরো ঘটনাটি রেলওয়ে ব্রিজের উপর থেকে দেখছেন বহু সংখ্যক মানুষ।
ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, আবারও লাভ জিহাদের কারণে মুসলিম যুবককে ভালোবাসে খুন হয়েছে এক হিন্দু যুবতী এবং তাঁর দেহ পাওয়া গেছে একটি স্যুটকেসের ভিতরে। উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন,“সেই লাভ জি*হাদ আর সেই সুটকেস... হিন্দু মেয়েরা ও তার বাবা-মায়েরা, আর কবে বুঝবে... একটু সুখের জন্য জীবনটা বিসর্জন ।” (সব বানান অপরিবর্তিত)
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওর সঙ্গে কোনও লাভ জিহাদ কিংবা মুসলিম যুবকের সম্পর্ক নেই। বরং গত ২১ মে বেঙ্গালুরুর চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের নিচে একটি স্যুটকেসের মধ্যে পাওয়া কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলেই হিন্দু।
সত্য উন্মোচন হলো যেভাবে
ভাইরাল দাবি ও ভিডিওটির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ২০২৫ সালের ২১ মে একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশনে ভিডিওটিকে গত ২১ মে বেঙ্গালুরুর চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপশি এই একই ভিডিও একই দাবি-সহ অন্য একাধিক ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল ও ইউটিউব চ্যানেলেও পাওয়া যায়।
এরপর উক্ত তথ্যের উপরে ভিত্তি করে পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে গত ২১ মে একাধিক কন্নড় ও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেইসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ২১ মে বেঙ্গালুরুর আনেকাল এলাকার চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের নিচে একটি স্যুটকেসের ভিতরে এক কিশোরীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের তরফে অনুমান করা হয়েছে যে, মৃত ওই কিশোরীকে অন্য কোথাও খুন করা হয়। তারপর দেহ একটি স্যুটকেসে ভরে চলন্ত ট্রেন থেকে চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের কাছে ফেলে দেয় দুষ্কৃতীরা। এই ঘটনায় স্থানীয় সূর্যনগর থানায় একটি এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
এরপর এবিষয়ে আরও অনুসন্ধান চালালে ২০২৫ সালের ৮ জুন ভাইরাল স্যুটকেসের একাধিক ছবি-সহ এশিয়ানেট নিউজ কন্নড়ে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২১ মে চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের নিচে একটি নীল রঙের স্যুটকেসের ভিতরে পাওয়া কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় মোট ৭ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে সূর্যনগর থানার পুলিশ। পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, মৃত কিশোরী বিহারের বেলারু গ্রামের বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী রীমা কুমারী। তাকে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত ১৫ মে বিহার থেকে বেঙ্গালুরু নিয়ে যায় তার প্রেমিক আশিক কুমার এবং ১৮ মে তারা বেঙ্গালুরু পৌঁছায়।
কিন্তু বেঙ্গালুরুতে পৌঁছানোর পর ওই কিশোরী শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে অস্বীকার করলে তার প্রেমিক আশিক কুমার প্রথমে তার উপরে শারীরিক অত্যাচার চালায় এবং শেষে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এই ঘটনার পর আশিক তার আত্নীয়দের সহযোগীতায় রীমার দেহ একটি নীল রঙের স্যুটকেসের মধ্যে ভরে তা চলন্ত ট্রেন থেকে চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়। এরপর তারা সকলেই বিহারে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বেঙ্গালুরুর সূর্যনগর থানার পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমে সিসিটিভি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে এবং বিহার থেকে ৭ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে সূর্যনগরে নিয়ে আসে। ধৃত ৭ অভিযুক্ত হল, আশিক কুমার, মুকেশ রাজবংশী, ইন্দুদেবী, রাজারাম কুমার, পিন্টু কুমার, কালু কুমার এবং রাজু কুমার। অন্য একাধিক প্রতিবেদনেও এই একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে অর্থাৎ এটি কোনও লাভ জিহাদের ঘটনা কিনা কিংবা এর সঙ্গে কোনও মুসলিম ব্যক্তি জড়িত কিনা তা নিশ্চিত করতে আমরা সূর্যনগর থানার এসএইচও সঞ্জীব মহাজানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “এই ঘটনার সঙ্গে কোনও লাভ জিহাদ কিংবা মুসলিমের সম্পর্ক নেই। বরং রীমা কুমারীর মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রধান অভিযুক্ত আশিক কুমার-সহ বাকি সকল অভিযুক্তই হিন্দু। পাশাপশি অশিক কুমার এবং রীমা কুমারী পূর্ব পরিচিত এবং তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আমরা ইতিমধ্যে সকল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছি। বর্তমানে তারা জেল হেফাজতে রয়েছে।”
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, মিথ্যে লাভ জিহাদের রং দিয়ে বেঙ্গালুরুর চন্দ্রপুরায় স্যুটকেসের ভিতরে এক কিশোরীর মৃতদেহ উদ্ধারের ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, লাভ জিহাদের জেরে মুসলিম যুবককে ভালোবাসে খুন হয়েছে এক হিন্দু যুবতী এবং তাঁর দেহ পাওয়া গেছে একটি স্যুটকেসের ভিতরে।
ভাইরাল ভিডিওর সঙ্গে কোনও লাভ জিহাদ কিংবা মুসলিম যুবকের সম্পর্ক নেই। বরং গত ২১ মে বেঙ্গালুরুর চন্দ্রপুরা রেলওয়ে ব্রিজের নিচের এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলেই হিন্দু।