
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষ থামার কোনও লক্ষণ নেই। এবার ইরানের বিরুদ্ধে বুধবার গভীর রাতে ইরাকের জলসীমায় আমেরিকার একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তিকে একটি যুদ্ধের ট্যাঙ্কের ভিতর থেকে এক ব্যক্তিকে জোর করে টেনে বার করতে দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা যুদ্ধের ট্যাঙ্ক-সহ ইজরায়েলের এক সেনা তথা গুপ্তচরকে আটক করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইসরাইলের সাজোয়া গাড়ি ও সৈনিক, ইরানি সৈন্যরা আটক করে রেখেছে।” (সব বানান অপরিবর্তিত)
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি ইরানের বিপ্লবী গার্ডের তরফে ইজরায়েলি সেনা বা গুপ্তচরকে আটকের দৃশ্য নয়। বরং সেটি ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সিরিয়ার আলেপ্পোতে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী সদস্যদের তরফে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর একজন জওয়ানকে আটকের দৃশ্য।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল দাবি ও ভিডিওটির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি এক হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষের কোনও সম্পর্ক নেই। ভিডিও-র ক্যাপশন অনুযায়ী সেটি সিরিয়ার হামা এলাকায় সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী সদস্যদের তরফে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর একজন জওয়ানকে আটকের দৃশ্য।
তবে উক্ত ভিডিও-র কমেন্ট সেকশনে অপর এক ব্যক্তি পোস্টাদাতাকে সংশোধন করে জানান যে, ভিডিওটি হামা এলাকায় নয়, বরং সেটি সিরিয়ার আলেপ্পো এলাকার M4 মহাসড়কের দৃশ্য। এবং পোস্টদাতাকেও তাকে সংশোধন করে দেওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিকে ধন্যবাদজ্ঞাপন করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর অপর একটি এক্স হ্যান্ডেলে অন্য দিক থেকে তোলা ওই একই ব্যক্তির আটকের দ্বিতীয় একটি ভিডিও পাওয়া যায়। দ্বিতীয় ভিডিওতে ঘটনাস্থলটির পারিপার্শ্বিক কিছু দৃশ্যও দেখা যায়।
পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের আরবি টেলিভিশন চ্যানেল Aljazeera Mubasher-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিও-র শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, "আলেপ্পো এবং রাক্কার সংযোগকারী M4 মহাসড়কের ধরে সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী বেশ কয়েকটি যানবাহন এবং অস্ত্র নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে।" সেই ভিডিও-র ২:৪৫ থেকে ২:৫০ মিনিটের ফ্রেমের সঙ্গে উপরে উক্ত দ্বিতীয় ভিডিও-র দৃশ্যের হুবহু মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ দ্বিতীয় ভিডিওতে থাকা রাস্তা, রাস্তার পাশে থাকা বাড়ি এবং ইলেকট্রিক পোষ্টকে আল জাজিরার ভিডিওতেও একই স্থানে দেখা যায়।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর জার্মান সংবাদমাধ্যম DW-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টানা দু’দিনের লড়াইয়ের পর সিরিয়ান সেনাবাহিনীর হাত থেকে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো দখল করে নেয় সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এই লড়াইয়ে নিহত হয় সিরিয়ান সেনাবাহিনীর বহু জওয়ান এবং তাদের অনেকেই আটক করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা। পাশাপাশি এখানে উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমেরিকা এবং ইজরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিদেশী নাগরিক-সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে ইরান। তবে তাদের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও-র কোনও সম্পর্ক নেই।
এর থেকে প্রামণ হয় যে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের হাতে আটক ইজরায়েলি সেনা দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে সিরিয়ার পুরনো ভিডিও।
ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক-সহ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের হাতে আটক এক ইজরায়েলি সেনা।
ভিডিওটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়ার আলেপ্পোতে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী সদস্যদের তরফে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর একজন জওয়ানকে আটকের দৃশ্য।