
ভারতের গণতন্ত্রের মন্দির হিসেবে পরিচিত সংসদেই কি এখন থেকে নিষিদ্ধ হয়ে গেল 'জয় হিন্দ' বা 'বন্দেমাতরম'-এর মতো শব্দ? যে বাণী ভারতের স্বাধীনতার বীজ পুঁতেছিল, সেই শব্দদ্বয়কে খোদ গণতন্ত্রের পীঠস্থান থেকে ব্রাত্য করে দেওয়া হলো? গত ২৪ ঘণ্টা ধরে বাংলার রাজনীতি তোলপাড় এই প্রশ্ন নিয়েই।
বুধবার যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন। সেই সঙ্গে ২৬ নভেম্বর বর্তমান পত্রিকাতেও এই নিয়ে একটি খবর (ডিজিটাল সংস্করণ) ছাপা হয়। যার শিরোনামে লেখা ছিল, “সংসদে নিষিদ্ধ 'জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম'। শীতকালীন অধিবেশনের আগে গেরুয়া ফতোয়া।”
সংসদে ‘বন্দেমাতরম’ এবং ‘জয় হিন্দ’ নিষিদ্ধ হয়েছে দাবি করে জি ২৪ ঘণ্টায় একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় এবং ওয়েবসাইটেও একটি খবর প্রকাশ পায়।
তৃণমূল সমর্থকদের একটা বড় অংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়ার ভিডিওটি পোস্ট করে সঙ্গে লেখেন, “বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে পার্লামেন্টের ভেতরে বন্দে মাতরম গাওয়া নিষিদ্ধ, জয় হিন্দ বলা নিষেধ।”
তবে আজতকের ফ্যাক্ট চেক টিম যখন এই বিতর্ক নিয়ে অনুসন্ধান চালায় তখন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। যা থেকে পরিষ্কার হয় যে সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু সংবাদ মাধ্যমে যে ধরনের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তাতে পুরো সত্যিটা প্রকাশ্যে আসছে না। সেই সঙ্গে কিছু বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছে।
তাই এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আজতকের ফ্যাক্ট চেক টিম কয়েকটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এবং এই বিষয় নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তি কাটানোর চেষ্টা করেছে।
প্রথম প্রশ্ন: এহেন বিজ্ঞপ্তি প্রথম ঠিক কবে জারি করা হয়েছে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ঠিক কী বলা হয়েছে?
তৃতীয় প্রশ্ন: এই বিজ্ঞপ্তিতে কি 'জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম' কথাগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে?
চতুর্থ প্রশ্ন: কী কারণে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে?
পঞ্চম প্রশ্ন: এই বিজ্ঞপ্তির পর কি সংসদে 'জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম' কথাগুলো বলা যাবে না?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিওয়ার্ড সার্চ করা হলে সবার প্রথম ২০২৪ সালের জুলাই মাসে নিউজ ১৮ হিন্দি, এবং ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর আজতকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কিছু খবর পাওয়া যায়। সেই খবরগুলিতে একই কথা লেখা ছিল। সেখানে শিরোনামে উল্লেখ করা হয় যে, “বন্দে মাতরম, আপনাকে ধন্যবাদ, জয়হিন্দ-এর মতো স্লোগান যেন রাজ্যসভায় না তোলা হয়। সংসদে অধিবেশন শুরুর আগে সাংসদদের নিয়ম মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এর থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে এহেন বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশাবলী নতুন নয়। বরং ২০২৩ সালেও একই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। প্রত্যেক বছর সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে সেই নিয়মাবলী সাংসদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়। তবে 'বর্তমান' পত্রিকার প্রতিবেদনে এ কথা একবারও উল্লেখ করা হয়নি সাংসদের উদ্দেশে এই নিয়ম আগেই জারি করা হয়েছে। বরং, এই প্রতিবেদন পড়লে মনে হবে, এহেন নিয়ম যেন শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই চালু করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর, অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তিতে কী বলা হয়েছিল, সেই বিষয়ে কিওয়ার্ড সার্চ করা হলে প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তির পিডিএফ ফাইল রাজ্যসভার ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে।
এই বিজ্ঞপ্তির ৭২ নম্বর পাতার ৬ নম্বর পয়েন্টে লেখা হয়, “The decorum and the seriousness of the proceedings of the House require that there should be no "Thanks", "Thank You", "Jai Hind", "Vande Mataram" or any other slogans raised in the House.” এই বাক্যটিকে বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “অধিবেশনের (লোকসভা/রাজ্যসভা) আচরণবিধি এবং কার্যবিবরণীর গুরুত্বের কারণে সভা চলাকালীন ধন্যবাদ, আপনাকে ধন্যবাদ, জয় হিন্দ, বন্দেমাতরম অথবা অন্য কোনও স্লোগান তোলা উচিত নয়।”
এই বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমেই আমাদের তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরও পরিষ্কার হয়ে যায় যে 'জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম' কথাগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোথাও লেখা হয়নি যে এই কথাগুলি বলা নিষিদ্ধ। বরং সভাকক্ষের আচরণবিধি এবং কার্যবিবরণীর গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে এই ধরনের কিছু স্লোগান তুলতে না বলা হয়েছে, যা সভার কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করে।
চতুর্থ এবং পঞ্চম প্রশ্নের উত্তর পেতে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং লোকসভার অবসরপ্রাপ্ত মহাসচিব পি. ডি. থানকাপ্পান আচারির সঙ্গে। তিনি আমাদের স্পষ্ট জানান যে এই বিজ্ঞপ্তি কোনও ভাবেই 'জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম' কথাগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা নয়। আচারি বলেন, “সকল সাংসদের জন্য কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে, যা নিয়মের মধ্যে আছে। আর সেই নিয়মগুলির মধ্যে একটি বলে যে, সভাকক্ষের মধ্যে কোনও ধরনের স্লোগান দেওয়া যাবে না। ‘বন্দেমাতরম’ এবং ‘জয় হিন্দ’ এগুলোও সেই স্লোগান দেওয়ার মধ্যেই আসতে পারে। মূল কথা হলো, স্লোগান তুলে যেন কোনও ভাবেই সভাকক্ষের পবিত্রতা নষ্ট না করা হয়। সভাকক্ষ কোনও স্লোগান তোলার জায়গা নয়।”
আচারি স্পষ্ট করে দেন যে, জাতীয় গান বন্দেমাতরম গাওয়া বা বাজানো, এবং একে স্লোগান হিসেবে তোলা, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একে যেন গুলিয়ে না ফেলা হয়। তাঁর কথায়, “অধিবেশন শেষে সভাকক্ষ মুলতুবি হওয়ার আগেও বন্দেমাতরম বেজে ওঠে। ফলে বন্দেমাতরম গান গাওয়া, গান বাজানো এবং এর স্লোগান তোলা এক জিনিস নয়। পৃথক পরিস্থিতি এবং পার্থ্যক বুঝতে হবে। কিন্তু একে স্লোগান হিসেবে তোলা খুবই খারাপ বিষয়। এটা সর্বদা বর্জনীয়, নিয়মের বাইরে।”