
দিনকয়েকের বিরতির পর ১ এপ্রিল আবারও ইজরায়েলের বুকে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইরান। একাধিক সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, গত তিন সপ্তাহের মধ্যে ১ এপ্রিলের হামলাই ছিল সবথেকে বড়। এই আবহে আবারও সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে ইজরায়েলের উপর ইরানের হামলার দৃশ্য বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনে এমনই তিনটি আলাদা-আলাদা ভিডিওর সত্যতা যাচাই হচ্ছে।
প্রথম ভিডিও
এই ভিডিওতে একটি ধ্বংসস্তূপসম এলাকায় ধারণ করা একটি ভিডিও দেখা যাচ্ছে। ভিডিওতে ক্ষতিগ্রস্ত বহুতল, যার নিচে আগুন জ্বলতে এবং কালো ধোঁয়া বেরোতে দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাস ও একাধিক গাড়িও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “গতকাল রাতে ইরানের ভয়াবহ মিসাইল হামলার পর তেল আবিব জ্বলছে।”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি আসল কোনও ঘটনার নয়, বরং এআই দ্বারা তৈরি।
ভাইরাল ভিডিওতে @babo_entrepreneur নামক একটি টিকটক আইডির ওয়াটারমার্ক দেখা যাচ্ছে। এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করলে ওই আইডিতে এই ধরনের অনেক ভিডিও পাওয়া যায় যা এআই দ্বারা তৈরি বলে অনুমান করা যায়।
আলোচ্য় ভিডিওটির কমেন্ট সেকশনে দেখা যায় একজন কমেন্টে ভিডিওটিকে এআই বলে উল্লেখ করে এর প্রশংসা করেছেন। যার উত্তরে ইতিবাচক ইমোজি ব্যবহার করে ওই টিকটক ব্যবহারকারীকে সম্মতি প্রকাশ করতে দেখা যায়। এর থেকে সন্দেহ হয় যে ভিডিওটি এআই দ্বারা তৈরি হতে পারে।
হাইভ মডারেশনের মতো এআই যাচাইকারী টুল দ্বারা পরীক্ষা করা হলে ভিডিওটি ৭১ শতাংশই এআই নির্মিত বলে ফলাফলে জানানো হয়।
দ্বিতীয় ভিডিও
এই ভিডিওতে দূরে থাকা কতগুলি বহুতলে একটি ড্রোন হামলা হতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে যে, ইজরায়েলের সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে ইরান। এবং নিখুঁতভাবে সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করেই হামলা চলেছে যার জেরে নিশ্চিতভাবে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে ফ্যাক্ট চেক করে দেখা গেছে, এই ভিডিওটি ইজরায়েল বা ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই ঘটনাটি চলতি বছর ৯ জানুয়ারির যখন ইউক্রেনের কিভ শহরে একটি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল রাশিয়া।
ভাইরাল ভিডিওটিতে থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ‘КАШТАН news’ লেখা একটি ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়। এটি ইউক্রেনের কিয়েভের একটি স্থানীয় স্বাধীন ডিজিটাল গণমাধ্যম সংস্থা।
উক্ত চ্যানেলের ইউটিউব চ্যানেলে ভাইরাল ক্লিপটি গত ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। ভিডিওটির শিরোনাম থেকে বোঝা যায় যে, এতে ৯ জানুয়ারি কিভের একটি আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোনের হামলার ফুটেজ দেখানো হয়েছে।
এই সম্পর্কে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনেও নানা তথ্য পাওয়া যায়। রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ৯ জানুয়ারি রাশিয়ান ড্রোন কিভের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায়, এতে চারজন নিহত এবং অন্তত ১৯ জন আহত হন। এই হামলায় আবাসিক ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং ইউক্রেনের রাজধানীর বেশ কয়েকটি জেলায় আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়।
তৃতীয় ভিডিও
এই ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে দূরে একটি একটি এলাকায় আগুন জ্বলতে ও ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। আচমকাই সেখানে সশব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং যারা ভিডিও করছিলেন, তারা উদ্ভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি শুরু করেন।
এই ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, এটি ইজরায়েলের অস্ত্রভান্ডারে ইরানের হামলার ভিডিও।
তবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এই ভিডিওটি ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনায় হওয়া একটি রাসায়ানিক কারখানায় বিস্ফোরণের ভিডিও।
রিভার্স সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও Kanal13 নামের মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর ভিডিওটি আপলোড করে লেখা হয়, আর্জেন্টিনার বুয়োনেস আইরিস প্রভিন্সে একটি শিল্পাঞ্চলে লাগা আগুন থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমেও এই ঘটনার আলাদা ভিডিও দেখা যাবে।
অর্থাৎ সবমিলিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে অসম্পর্কিত ও পুরনো ভিডিও ছড়িয়ে ইরানের হামলার দৃশ্য বলে দাবি করা হচ্ছে যা বিভ্রান্তিকর।
একাধিক ভিডিওতে ইজরায়েলের উপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ভাইরাল ভিডিওগুলির মধ্যে একটি এআই দ্বারা তৈরি, একটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইউক্রেনের কিভে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পুরনো ভিডিও, এবং আরেকটি আর্জেন্টিনার একটি রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণের ফুটেজ।