
বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবথেকে বড় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে ইজরায়েল ও ইরান। সেই সঙ্গে এই সংঘর্ষের আঁচ পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও। এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে অসংখ্য ভিডিও। এর মধ্যে কিছু ভিডিও ছড়িয়ে ইরান দ্বারা ইজরায়েলে ও দেশটির রাজধানী তেল আবিবে হাইপারসনিক মিসাইল হামলার দাবি করা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে সে রকমই তিনটি ভিডিও-র সত্যতা যাচাই করা হয়েছে।
এই ভিডিওটি দেখলে মনে হবে কোনও একটি বহুতলের ব্যালকনি থেকে রেকর্ড করা। আচমকাই চোখের পলকে একটি মিসাইল দূরে আছড়ে পড়ছে। চার সেকেন্ডের এই ভিডিওটি ইজরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে করা ইরানের হামলার দৃশ্য বলে শেয়ার করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে এই ভিডিওটি আসল কোনও ঘটনার নয়। বরং এই ভিডিওটি এআই দ্বারা তৈরি।
ভাইরাল ভিডিওটি থেকে স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ভিডিওটি খোঁজা হলে কোনও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এই ভিডিও সংক্রান্ত কোনও খবর পাওয়া যায় না। তবে তুর্কি টুডে নামের একটি সংবাদ মাধ্যমে উল্লেখ করা হয় যে ইরানের পক্ষ থেকে খেইবার নামের হাইপারসনিক মিসাইল ইজরায়েলের উদ্দেশ্যে ছোড়া হয়েছে।
তবে ভাইরাল ভিডিওতে বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। যে কারণে ভিডিওটি এআই দ্বারা তৈরি কিনা তা যাচাই করতে হাইভ মডারেশনের মতো এআই যাচাইকারী টুলে ভিডিওটি পরীক্ষা করা হয়। যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভিডিওটি এআই দ্বারা নির্মিত।
এই ভিডিওটিও কোনও বহুতলের বারান্দা বা ব্যালকনি থেকেই ধারণ করা। ভিডিওতে একটি ধোঁয়ার রেখা উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। এর পরেই মুহূর্তের মধ্যে একটি মিসাইল আছড়ে পড়ছে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। ভিডিওটি ইংরাজিতে লিখে যে ক্যাপশনে শেয়ার করা হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ হল — “ইজরায়েলের তেল আবিবে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ইজরায়েলের অপারেশন রাইজিং লায়ন ইরানের গভীরে আঘাত হানার কয়েক ঘন্টা পর, তেহরান শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।”
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি ইজরায়েলের হলেও সাম্প্রতিক সংঘর্ষের নয়। এই ভিডিওটি অন্তত ৮ মাস আগেকার।
ভাইরাল ভিডিওটি গুগল লেন্সের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও ইউকে ভিত্তিক টাইমস নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে। এই ভিডিওটি ২০২৫ সালের ১৪ জুন আপলোড করা হয়েছিল। এই ভিডিওতে অন্যান্য ক্লিপের পাশাপাশি ভাইরাল ক্লিপটিও ছিল। ক্যাপশন অনুযায়ী, ইজরায়েলের হামলার জবাবে ইরান যে পাল্টা হামলা চালায় এখানে সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিও-র ৫০ সেকেন্ডের পরবর্তী অংশে ভাইরাল ক্লিপটি দেখা যাবে। এর থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভিডিওটির সঙ্গে বর্তমান সংঘর্ষের কোনও সম্পর্ক নেই।
এই ভিডিওতে আকাশে সারিবদ্ধ আকারে তীব্র গতিতে লাল রঙের রোশনাই ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে, যা নাকি ইরানের ছোড়া হাইপারসনিক মিসাইল বলে দাবি করা হয়েছে। একটি ক্লিপেই এখানে দুটি পৃথক ভিডিও রয়েছে, যেখানে প্রায় একই ধরনের লাল আলোর বিচ্ছুরণ আকাশে দেখা যাচ্ছে এবং একে ইরানের হাইপারসনিক মিসাইল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই ভিডিওগুলি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে সার্চ করা হলে এই একই ভিডিও ক্লিপগুলি দুটি পৃথক টিকটক হ্যান্ডেলে খুঁজে পাওয়া যায়। একটি ভিডিও গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ও অপর ভিডিওটি ৭ ফেব্রুয়ারি উভয় দুটি টিকটক হ্যান্ডেলে আপলোড করা হয়েছিল। সেই সময়ে সাম্প্রতিক ইজরায়েল-ইরান সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়নি। অর্থাৎ, বুঝতে বাকি থাকে না যে এর সঙ্গে বর্তমান সংঘর্ষের কোনও সম্পর্ক নেই।
যদিও ভিডিওগুলির সম্পর্কে বিশদ কোনও তথ্য সেই হ্যান্ডেলগুলিতে উল্লেখ করা হয়নি। তবে একই ধরনের আরও একাধিক ভিডিও ওই হ্যান্ডেলে দেখতে পাওয়া যায়। ফলে ভিডিওগুলি এআই দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকতে পারে, এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
হাইপারসনিক মিসাইল কী এবং কীভাবে কাজ করে?
হাইপারসনিক মিসাইল হলো এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র যা শব্দের গতির ৫ গুণেরও বেশি গতিতে (ম্যাক ৫ বা বেশি) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।, অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০০০ কিমি বা তারও বেশি গতি অর্জন করে। এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই মিসাইল মাঝ আকাশে রাস্তা বদল করতে সক্ষম। সেই সঙ্গে রেডারকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এই মিসাইলকে প্রচলিত ব্যালেস্টিক তথা ক্রুজ মিসাইলের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
ভিডিওগুলিতে দেখা যাচ্ছে ইরান কীভাবে হাইপারসনিক মিসাইল দ্বারা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে।
প্রথম ভিডিওটি এআই দ্বারা তৈরি। দ্বিতীয়টি ২০২৫ সালের জুন মাসেই। এবং তৃতীয়টি সাম্প্রতিক সংঘর্ষ শুরুর আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রয়েছে।