
মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সবথেকে পবিত্র রমজান মাস ইদ-উল-ফিতরের মাধ্যমে শেষ হয়েছে দিনকয়েক আগেই। এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও শেয়ার করে এক বিস্ফোরক দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তি জুতো হাত চাদর মুড়িয়ে বসে থাকা অপর একজনকে মারছে।
ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, এই ভিডিওটি দিল্লির কোনও সরকারি অফিসের। যেখানে নাকি কোনও রোজাদার মুসলিম মহিলা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে তাঁকে তাঁর এক হিন্দু সহকর্মী এভাবে মারধর করেছে। ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “দিল্লিতে এক সরকারি অফিসে, রোজাদার ক্লান্ত মুসলিম মহিলা কর্মচারীকে জুতা দিয়ে মেরে গুড মর্নিং জানাচ্ছে হিন্দু সহকর্মী। অফিসের সহকর্মী পুরুষের কাছে নারীদের চরিত্র সতিত্ব ইজ্জত সম্মান নিরাপদ নয়। অনেক মহিলা পেটের দায়ে পুরুষ না থাকার কারণে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করতে হয়,আর এই সুযোগ টাকে লাগিয়ে নারীদের ফাঁদে ফেলে অফিসের লোক, আর অমুসলিম রা ত ইসলাম বিদ্বেষ থেকে ইচ্ছে করে মুসলমানদের নির্যাতন করে।”
প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত শুধু এই একটি পোস্ট কমপক্ষে ৪৪ হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে।
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি দিল্লির নয়, কোনও সরকারি অফিসেরও নয়, এমনকি এখানে কোনও মুসলিম বা মহিলাকেও মারধর করতে দেখা যাচ্ছে না।
সত্য উদঘাটন
ভাইরাল ভিডিওটিতে যে ব্যক্তি মারধর করছেন তাকে এক পর্যায়ে বলতে শোনা যাচ্ছে, “ভাই এখনও ঘুমেই আচ্ছন্ন। চপ্পলেও উঠল না।” যা থেকে অনুমান করা যায় যে ভিডিওটিতে যাকে মারা হচ্ছে সে নারী না হয়ে পুরুষ হতে পারে।
এরপর রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই ভিডিওটি Newsindia1st নামের একটি ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়। সেখানে ক্যাপশনে লেখা হয়, ট্রেনিংয়ের নামে মারধর, ক্যামেরায় উঠে এল চমকে দেওয়া তথ্য। অর্থাৎ, এই ক্যাপশন অনুযায়ী ভিডিওটি কোনও ট্রেনিংয়ের অংশ হতে পারে।
এরপর কিওয়ার্ডের মাধ্যমে সার্চ করা হলে আসল ভিডিওটি “Commando Academy Life” নামের ইউটিউব চ্যানেলে খুঁজে পাওয়া যায় যা গত ২৬ জানুয়ারি আপলোড করা হয়েছিল। ভিডিওটির ক্যাপশনে হিন্দিতে শুধুমাত্র লেখা হয়, “ঘুম দিচ্ছিল।” আপলোডের সময় থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভিডিওটির সঙ্গে রমজান মাস বা রোজার সম্পর্র থাকা সম্ভব নয়।
২৫ জানুয়ারি ওই একই ব্যক্তির জুতো হাতে নিয়ে মারধর করার আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে চাদর গায়ে বসে থাকা ব্যক্তিকে বকাবকি করতে করতে সে যা বলছে তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “মুখ লুকিয়ে রাখ নাহলে সবাই জানতে পেরে যাবে তুই বিড়ি খেয়েছিলি। কখন খেয়েছিলি? (অন্যদিকে তাকিয়ে) এখানে খেয়ে এসেছিল? অ্যাকাডেমিতে?”
উক্ত বিষয়গুলি থেকে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে দিল্লির কোনও সরকারি অফিসের বা কোনও সাম্প্রদায়িক যোগ নেই। ইউটিউব চ্যানেলে থাকা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আজতক ফ্যাক্ট চেক টিমকে জানানো হয় যে ঘটনাটি রাজস্থানের কুচামান শহরে অবস্থিত ভিসিএ ট্রেনিং অ্যাকাডেমির। এই অ্যাকাডেমিতে সেনাবাহিনী, নৌসেন, বায়ুসেনা, পুলিশের মতো নানা প্রশাসনিক বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার ট্রেনিং দেওয়া হয়।
ওই সংস্থার ম্যানেজার আমাদের নিশ্চিত করেন যে ভাইরাল ভিডিওতে থাকা উভয় ব্যক্তিই হিন্দু সম্প্রদায়ের। তিনি আরও জানান যে চাদর ঢেকে বসে থাকা ব্যক্তি একজন পুরুষ এবং এই ভিডিওটি ওই অ্যাকাডেমির লাইব্রেরীতে মজার জন্য রেকর্ড করে আপলোড করা হয়েছিল। যেহেতু নানা প্রশাসনিক বাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয়, তাই তাঁরা অ্যাকাডেমিতেও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা তাদের ছাত্রছাত্রীদের দেন।
অর্থাৎ, সবমিলিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে একটি ভুয়ো এবং ভিত্তিহীন দাবির সঙ্গে ভিডিওটি শেয়ার করে হয়েছে।
দিল্লির একটি সরকারি অফিসে রোজা রাখা এক মুসলিম মহিলা কর্মচারী ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ায় তাঁকে এক হিন্দু সহকর্মী জুতো দিয়ে মারধর করেছেন।
ভিডিওটি দিল্লির কোনও সরকারি অফিসের নয় এবং ঘটনাটিও সাম্প্রদায়িক নয়। ভিডিওটি রাজস্থানের কুচামানে একটি আর্মি/পুলিশ ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে ধারণ করা, যেখানে দুই ব্যক্তিই হিন্দু এবং ঘটনাটি মজার ছলে রেকর্ড করা হয়েছিল।