
১৬ অগাস্ট ১৯৪৬। এই একটি তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে এক রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৪৬ সালের এই দিনেই 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-র ডাক দেওয়া হয়েছিল। শহরের রাস্তা ছেয়েছিল হিংসা, রক্ত, অরাজকতায়। তারপর বহু দশক এতটা অশান্ত হয়নি তিলোত্তমা। তবে ছন্দ কাটে ১৯৯০ সালে। এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার হাজরা মোড় ফের সাক্ষী হয় এক চরম রাজনৈতিক সংঘর্ষের। এই একটি দিনই বদলে দিয়েছিল এক নেত্রীর জীবন।
সেই সময় যুব কংগ্রেসের দাপুটে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বয়স বছর ৩৫। বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল হচ্ছিল। তার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর পিছনে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ভিড়। হঠাৎই পিছন থেকে লাঠির আঘাত। প্রথম আঘাতেই মাথা ফেটে যায়। দ্বিতীয় আঘাতে রক্তে ভিজে যায় সাদা শাড়ি। পরবর্তীকালে চিকিৎসক এসবি গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, সেদিন মমতার মাথার খুলিতে ফাটল ধরেছিল। আর এক ইঞ্চি গভীর হলেই তা প্রাণঘাতী হতে পারত।
মাথার ব্যান্ডেজই হয়ে উঠল প্রতিবাদের প্রতীক
এহেন ভয়ঙ্কর আঘাতের পর অনেক নেতাই হয়তো দীর্ঘ বিশ্রামে চলে যেতেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই অন্য ধাতুতে গড়া। মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ নিয়েই প্রকাশ্যে এসে দাঁড়ালেন। সভা, সাংবাদিক বৈঠক; সর্বত্র সেই ব্যান্ডেজ। সে সময় শাসক বামফ্রন্ট তাঁকে কটাক্ষ করে 'নাটক' বললেও সাধারণ মানুষ দেখেছিল এক অন্য ছবি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে এক মহিলা, মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েও বিরোধী রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। কাগজে কাগজে তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'ওরা আমার মাথা ভাঙতে পারে, হাড় ভাঙতে পারে, কিন্তু মনোবল ভাঙতে পারবে না।'
এই একটি ঘটনার পর থেকেই রাজনীতিতে মমতার ইমেজ পাকাপাকিভাবে তৈরি হয়ে যায়।
সেখান থেকে আজ সুপ্রিম কোর্টে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি। বয়স এখন ৭০। প্রায় দেড় দশক ধরে মুখ্যমন্ত্রী। তবু তাঁর সেই লড়াইয়ের ধরণ আজও অপরিবর্তিত। নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মামলায় নিজে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হন।
সাদা শাড়ি, হাওয়াই চটি; সেই চিরাচরিত পোশাকে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এর আগে কোনও মুখ্যমন্ত্রী নিজে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রাজ্যের হয়ে সওয়াল করেননি। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে নজিরবিহীন। ফলে আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যবাসীর মনে যে তাঁর নতুন একটা ইমেজ তৈরি হল, তা বলাই বাহুল্য।
শুরুটা ১৯৮৪ তে
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিবিদ হিসাবে ১৯৮৪ সালেই 'ফার্স্ট ব্রেক' পেয়েছিলেন মমতা। মমতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের শুরু কিন্তু তারও অনেক আগে। তবে ১৯৮৪ সালে যাদবপুরে সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে লোকসভায় জয়টাই তাঁর লড়াইয়ের শুরু বলা যায়। অর্থ বা রাজনৈতিক পরিবার; কোনও সমর্থন ছাড়াই তাঁর এই জয় তাঁকে আলাদা করে পরিচিতি এনে দেয়।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ঘটনা
১৯৯৩ সালে এক প্রতিবন্ধী কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়েন মমতা। পুলিশ তাঁকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে ও গ্রেফতার করে। সেখানে দাঁড়িয়েই সেদিন প্রতিজ্ঞা নেন মমতা, সিপিএমকে সরিয়েই তিনি ফিরবেন বলেন সর্বসমক্ষে।
সেই বছরই ২১ জুলাইয়ের আন্দোলন হয়। পুলিশের গুলিতে ১৩ জনের মৃত্যু। পরে এই দিনই হয়ে ওঠে তৃণমূলের 'শহিদ দিবস'।
হুইলচেয়ার থেকে প্রচার
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পায়ে চোট নিয়েও হুইলচেয়ারে বসে প্রচার করেছিলেন মমতা। আবারও নিজের শরীরের চোট-আঘাতকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেন তিনি।
সিঙ্গুর আন্দোলন
২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটা ন্যানো কারখানার বিরুদ্ধে আন্দোলনও মমতার রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড়। ২৬ দিনের অনশন তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত কারখানা সরে যায় গুজরাতে। বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি ঘটনাতেই বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পথ রীতিমতো পাকা হয় যায়। তবে পরবর্তীকালে মমতার এই আন্দোলনের ফলে রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের দরজা বন্ধ হয়ে যায় বলেও দাবি বিশ্লেষকদের একাংশের।
জোট রাজনীতি ও সংঘাত
২০১২ সালে ইউপিএ সরকারের শরিক হয়েও রিটেল ব্যবসায় বিদেশি বিনিয়োগ ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্নায় বসেন। পরে জোট থেকেও বেরিয়ে আসেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রী মমতার নীতি বা আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তবে রাজনীতিবিদ ও নেত্রী হিসাবে মমতার ট্যালেন্ট কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তুমুল রাজনৈতিক ঝড়ের মুখেও সটান দাঁড়িয়ে এক সাদামাটা শাড়ির, হাওয়াই চটি পরা মহিলা। এমন এক মহিলা যিনি বিদেশ সফরেও যান, আবার রাস্তার চপের দোকানে হঠাৎ ঢুকে পড়েন, নিজে হাতে চা বানিয়ে সবাইকে খাওয়ান, আবার নবান্নে প্রশাসনিক মিটিংও করেন। মমতার এই ইমেজই তাঁর সবচেয়ে বড় ইউএসপি।