
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বঙ্গ সফরের দিনেই বিজেপির নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে তীব্র আক্রমণে নামল তৃণমূল কংগ্রেস। খেলার মাঠ দখল, সরস্বতী পুজো করতে না দেওয়া, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অভিযোগে বিজেপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাল শাসকদল।
শনিবার তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলেন ব্যারাকপুরের সাংগঠনিক সভাপতি ও তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক এবং রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু।
পার্থ ভৌমিক বলেন, ব্যারাকপুরের আনন্দপুরীর যে মাঠে অমিত শাহের সভা হচ্ছে, সেই মাঠে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষ খেলাধুলো করতেন, সরস্বতী পুজো ও মেলার আয়োজন হত। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে আর সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ। অথচ বাংলায় এসে অমিত শাহ একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী নাকি সরস্বতী পুজো করতে দেন না।
পার্থের কটাক্ষ, 'বিজেপির সভার জন্য মাঠ পরিষ্কার করা হয়, কিন্তু এলাকার মানুষের উৎসব, খেলা বা সংস্কৃতির জায়গা নেই কেন? বিজেপির জন্য মাঠ আছে, অথচ সাধারণ মানুষের জন্য নয় কেন?' এই প্রতিবাদেই আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি আনন্দপুরী মাঠের সামনে স্থানীয় মানুষকে নিয়ে আইএনটিটিইউসি গণ-অবস্থানে বসবে বলেও জানান তিনি।
আনন্দপুরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গেও বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দাগে তৃণমূল। ব্রাত্য বসু বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী মৃতদের পরিবার পিছু ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করলেও এখনও পর্যন্ত সেই টাকা আদৌ দেওয়া হয়েছে কি না, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। তাঁর প্রশ্ন, 'কুম্ভমেলায় এত মানুষ মারা গেল। সেখানেও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কতজন পেয়েছেন? তাহলে আনন্দপুরের ক্ষেত্রেই বা কী হবে?'
ব্রাত্য আরও বলেন, 'ভোট এলেই বিজেপির বাংলার কথা মনে পড়ে। ভোট মিটলেই সব প্রতিশ্রুতি উধাও হয়ে যায়।' তিনি জানান, ২০২৫ সালের এপ্রিলে গুজরাটে আনন্দপুরের মতো একটি গুদাম কাণ্ডে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেখানেও রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই ছবি মধ্যপ্রদেশের হারদা কিংবা রাজস্থানের জয়সলমীরের ঘটনাতেও। ব্যঙ্গের সুরে ব্রাত্য বলেন, 'ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি, ভোটের পরে ধোঁকা, এটাই বিজেপির নীতি।'
শাহের সভা ঘিরে বিজেপির ‘দুশো পার’ স্লোগান নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। বলেন, “এবারও নিশ্চয়ই দুশো পারের গল্প শোনাবেন। কিন্তু এবারের ভোটেও সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না।” আরও বলেন, 'বাংলায় এসে ছ্যাঁদা না খুঁজে নিজের ঘর সামলান। যতই হামলা করুন, বাংলা আবার জিতবে। আপনারা যদি বুনো ওল হন, তৃণমূল বাঘা তেঁতুল।'
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণ করেন ব্রাত্য। তাঁর দাবি, বিজেপি তৃণমূলকে রোহিঙ্গাদের দল বলে আক্রমণ করে, অথচ মালদহে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে বিজেপিরই বুথ সভাপতি গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'তাহলে সীমান্ত সুরক্ষা আর গরু পাচার রোধ, এসব কার দায়িত্ব?'
ভোটাধিকার নিয়েও বিজেপির দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে ব্রাত্য বলেন, 'একদিকে নোটা রেখে ভোট না দেওয়ার অধিকার দেওয়া হচ্ছে, আবার বলা হচ্ছে ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। এক দেশে দুই নীতি কেন?' এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে মাধ্যমিক পরীক্ষা বানচালের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে অমিত শাহের বঙ্গ সফরের আগেই বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর আরও চড়াল তৃণমূল। মাঠ, সংস্কৃতি, ক্ষতিপূরণ থেকে ভোটাধিকার, সব প্রশ্নেই বিজেপিকে চাপে রেখে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র করার বার্তা দিল শাসকদল। এখন দেখার, ব্যারাকপুর ও উত্তরবঙ্গের সভা থেকে এই সব অভিযোগের জবাবে অমিত শাহ কী বলেন।