
কলকাতার ময়দান একসময় ছিল তাঁর রোজগারের প্রধান ভরসা। ভোর হলেই হুগলির আরামবাগ থেকে শহরের উদ্দেশে রওনা দিতেন শেখ রিয়াজুল। ময়দান থেকে খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেট, ঘুরে ঘুরে প্যাটিস বিক্রি করাই ছিল তাঁর দৈনন্দিন কাজ। গত ২২ বছর ধরে এভাবেই সংসার চালিয়েছেন তিনি। কিন্তু এখন সেই ময়দানের দিকেই পা বাড়াতে ভয় পাচ্ছেন রিয়াজুল।
রিয়াজুলের কথায়, 'আগে প্রতিদিন ময়দানে যেতাম। এখন আর যাই না। খিদিরপুর রুটের বাসে প্যাটিস বিক্রি করি। ময়দানে যেতে ভয় লাগে, খারাপও লাগে।' ফোনে কথা বলতে বলতে তাঁর গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক আর কষ্টের ছাপ। তিনি জানান, ব্রিগেডের সভায় যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস পাননি।
গত বছরের ডিসেম্বরে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানের দিনেই তাঁর জীবনে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। অভিযোগ, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েক জন তাঁর কাছ থেকে প্যাটিস কিনতে এসে নাম জিজ্ঞাসা করার পর আচমকাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। রিয়াজুলের দাবি, তাঁর প্যাটিস মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়, মারধর করা হয় এবং কান ধরে ওঠবসও করানো হয়। সেই ঘটনার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে।
এই ঘটনায় প্রায় তিন হাজার টাকার খাবার নষ্ট হয়েছিল বলে জানান রিয়াজুল। তাঁর বক্তব্য, তিনি কাউকে মিথ্যে বলে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করেননি। বলেন, 'ডজন তিনেক প্যাটিস বিক্রি হয়েছিল। চিকেন প্যাটিসই বেশি ছিল। কিন্তু হঠাৎ নাম জিজ্ঞাসা করে কয়েক জন মাল নষ্ট করে দিল, মারধরও করল।'
ঘটনার পর পুলিশ তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করলেও পরে তারা জামিন পেয়ে যায়। কিন্তু তাতে রিয়াজুলের আতঙ্ক কমেনি। তাঁর কথায়, 'কীসের স্বস্তি? আমি কাজ করলে বাড়ির লোক খেতে পায়। আর এখন আমিই কাজে যেতে ভয় পাচ্ছি। আমার মাল নষ্ট হয়েছে, আমাকে মারধর করা হয়েছে। সেই অসম্মানের দাম কে দেবে?'
রিয়াজুলের পরিবারও উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। তাঁর স্ত্রী চান না তিনি আর কলকাতায় কাজে যান। রিয়াজুল বলেন, 'আমাকে সবাই চিনে ফেলেছে। আবার যদি কেউ আক্রমণ করে?'
রাজনৈতিক তরজা যাই থাক, সেই বিতর্কের মাঝখানে পড়ে এখনও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন রিয়াজুল। যে ময়দান একসময় তাঁর রোজগারের জায়গা ছিল, আজ সেই জায়গাটাই তাঁর কাছে ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।