
রান্নাঘরে নুন মানেই সাধারণত সাদা পরিশোধিত লবণ। কিন্তু আজকাল অনেকেই ঝুঁকছেন বিট নুনের দিকে। বিশেষ করে ওজন কমানো, হজমশক্তি বাড়ানো বা ‘ডিটক্স’-এর নামে বিট নুন খাওয়ার চল বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে; সাধারণ সাদা নুনের চেয়ে বিট নুন খাওয়া কি সত্যিই বেশি স্বাস্থ্যসম্মত? নাকি এটি কেবল খাদ্যাভ্যাসের নতুন ট্রেন্ড? পুষ্টিবিদদের মতে, এই বিতর্কের উত্তর এতটা সরল নয়। প্রথমে বুঝতে হবে, সাদা নুন ও বিট নুনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী। বাজারে যে সাদা নুন পাওয়া যায়, তা মূলত পরিশোধিত সোডিয়াম ক্লোরাইড। এতে প্রায় ৯৯ শতাংশই সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতে আয়োডিন মেশানো হয়, যাতে আয়োডিনের ঘাটতি থেকে হওয়া থাইরয়েডের সমস্যা রোধ করা যায়।
অন্যদিকে বিট নুন বা 'ব্ল্যাক সল্ট' সাধারণত হিমালয় অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং এতে সালফার যৌগের উপস্থিতির কারণে একটি আলাদা গন্ধ ও স্বাদ থাকে। এই সালফারই বিট নুনকে আলাদা করে। আয়ুর্বেদে বিট নুনকে হজমের জন্য উপকারী বলা হয়েছে। অনেকে দাবি করেন, বিট নুন গ্যাস, অম্বল বা হজমের সমস্যায় সাহায্য করে।
তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, দু’ধরনের নুনেই মূল উপাদান সোডিয়াম। অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর; তা সে সাদা নুন হোক বা বিট নুন। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা কিডনির সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের সম্পর্ক বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। তাই নুনের ধরন বদলালেই ঝুঁকি কমে যাবে; এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আয়োডিন। ভারতে আয়োডিনের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। তাই আয়োডিনযুক্ত সাদা নুন ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়। বিট নুনে সাধারণত আয়োডিন মেশানো থাকে না। ফলে সম্পূর্ণ ভাবে সাদা নুন বাদ দিয়ে বিট নুনে ভরসা করলে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি হল পরিমিতি। দিনে কতটা নুন খাওয়া হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক সোডিয়াম গ্রহণ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা উচিত। অনেকেই না বুঝেই প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্যাকেটজাত স্ন্যাক্স বা ফাস্ট ফুডের মাধ্যমে অতিরিক্ত নুন খেয়ে ফেলেন।
বিট নুন স্বাদে আলাদা, কিছু বিশেষ পদে তা ব্যবহার করলে স্বাদ বাড়তে পারে। যেমন চাট, ফলের স্যালাড বা রায়তায় বিট নুন জনপ্রিয়। কিন্তু এটিকে ‘সুপারফুড’ ভাবার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সাদা নুনের তুলনায় এতে সামান্য কিছু খনিজ থাকতে পারে, তবে তার পরিমাণ এত কম যে তা আলাদা করে স্বাস্থ্যগত সুবিধা দেয়; এমন প্রমাণ স্পষ্ট নয়।
সুতরাং বিট নুন বনাম সাদা নুন বিতর্কে চূড়ান্ত রায় একটাই; অতিরিক্ত নুন নয়, পরিমিত নুনই স্বাস্থ্যকর। আয়োডিনের প্রয়োজন মেটাতে আয়োডিনযুক্ত নুন ব্যবহার করা জরুরি। আর বিশেষ স্বাদের জন্য মাঝে মাঝে বিট নুন ব্যবহার করতেই পারেন। তবে স্বাস্থ্য সচেতনতার নামে অতিরঞ্জিত দাবিতে ভেসে যাওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।