
আমাদের শরীরের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশই জল দিয়ে তৈরি। ঘাম, প্রস্রাব, শ্বাস-প্রশ্বাস, এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই প্রতিদিন শরীর থেকে অনেকটা জল বেরিয়ে যায়। তাই জল পান যে অত্যন্ত জরুরি, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, প্রতিদিন ঠিক কতটা জল পান করা উচিত? এতদিন ধরে প্রচলিত ‘৮ গ্লাস জল’ ফর্মুলা কি সত্যিই সবার জন্য প্রযোজ্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা এখন অনেকটাই পুরনো। মানুষের বয়স, শরীরের গঠন, জীবনযাত্রা ও শারীরিক পরিশ্রমের উপর নির্ভর করেই জল পান করার প্রয়োজন ভিন্ন হয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, আবার অতিরিক্ত জল কিডনির উপর চাপ ফেলতে পারে।
মেট্রো ইউকে-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এনএইচএস-এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডঃ জোনাথন ওয়েবস্টার জানিয়েছেন, বয়সভেদে জল গ্রহণের পরিমাণ বদলায়। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিপাক ও তৃষ্ণা অনুভব করার ক্ষমতাও পরিবর্তিত হয়।
বয়স অনুযায়ী জল পান করা কেন জরুরি?
শিশুদের শরীর দ্রুত জল হারায়, তাই তাদের তুলনামূলক বেশি জল দরকার হয়। আবার বয়স্কদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে অজান্তেই জল শূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। ভুল পরিমাণে জল পান করলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে হাইপোনাট্রেমিয়া (রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া) পর্যন্ত হতে পারে।
বয়স অনুযায়ী কতটা জল প্রয়োজন?
১-৩ বছর: প্রায় ১ লিটার (এর মধ্যে কিছুটা খাবার থেকেও আসে)
৪-৮ বছর: প্রায় ১.২ লিটার
৯-১৩ বছর: ১.৬-১.৯ লিটার
১৪-১৮ বছর: ১.৯-২.৬ লিটার
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ: প্রায় ৩.১ লিটার
প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা: প্রায় ২.৭ লিটার
গর্ভবতী মহিলা: প্রায় ৩ লিটার
স্তন্যদানকারী মহিলা: প্রায় ৩.১ লিটার
৬০ বছরের ঊর্ধ্বে: ১.৬-২ লিটার
গরমের সময়, ব্যায়াম করলে বা অসুস্থ হলে এই পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এক ঘণ্টায় ১ লিটারের বেশি জল পান করা উচিত নয়।
খুব কম বা খুব বেশি জল পান করলে কী হয়?
কম জল পান করলে ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, ইউটিআই বা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। আবার অতিরিক্ত জল পান করলে হাইপোনাট্রেমিয়া হতে পারে, যার লক্ষণ হিসেবে বিভ্রান্তি, বমি বমি ভাব, খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
কারও বেশি তৃষ্ণা লাগে, কারও কম, কেন?
জয়পুরের অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের চিকিৎসক ডঃ রোহিত শর্মা জানান, অতিরিক্ত তৃষ্ণার কারণ হতে পারে ডিহাইড্রেশন, বেশি নুন-ঝাল খাওয়া, গরম, অতিরিক্ত ঘাম বা ডায়াবেটিসের মতো রোগ। আবার একেবারেই তৃষ্ণা না লাগাও স্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, তৃষ্ণা লাগুক বা না লাগুক, সারাদিন জুড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘদিন ধরে তৃষ্ণার অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনও স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।