
Hindu Jain Common Holy Places India: ভারতের মানচিত্র জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গগনচুম্বী পাহাড়গুলি কেবল পর্যটনের আকর্ষণ নয়, বরং সেগুলি হাজার বছরের প্রাচীন আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান। হিন্দু ও জৈন ধর্মের বহু তীর্থস্থল এই পাহাড়গুলির চূড়াতেই অবস্থিত। কৈলাস পর্বত, গিরনার, শত্রুঞ্জয় বা সম্মেদ শিখরজীর মতো স্থানগুলি উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই অত্যন্ত পবিত্র। যদিও জৈন পরম্পরা মূলত অহিংসা, সত্য ও মোক্ষের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, তবুও হিন্দু ও জৈন ধর্মের মূল বিশ্বাসের গভীরে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। আর এই আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনের কারণেই ভারতের এই পর্বতগুলি দুই ধর্মের মানুষের কাছেই সমানভাবে পূজনীয়।
১. কৈলাস পর্বত
হিন্দু ধর্মে কৈলাস পর্বতকে দেবাদিদেব মহাদেবের পবিত্র বাসস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। এই পর্বতের পাদদেশেই রয়েছে পবিত্র মানস সরোবর হ্রদ, যা পুণ্যার্থীদের কাছে স্বর্গসম। অন্যদিকে, জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাস পর্বত এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর ভগবান আদিনাথ বা ঋষভদেব এই কৈলাস শিখরেই নির্বাণ লাভ করেছিলেন। জৈন শাস্ত্র ও প্রাচীন গ্রন্থে এই পবিত্র স্থানকে ‘অষ্টপদ’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, একাধারে শিবের ধাম এবং অন্যদিকে আদিনাথের মোক্ষস্থল হিসেবে কৈলাস আজও বিশ্ব আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু।
২. গিরনার পর্বত (গুজরাত)
গুজরাতের গিরনার পর্বত জৈন ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই এক জাগ্রত তীর্থ। জৈন পরম্পরা অনুসারে, এটি ২২তম তীর্থঙ্কর ভগবান নেমিনাথের নির্বাণ ভূমি। ধর্মীয় কাহিনী বলছে, ভগবান নেমিনাথ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সমসাময়িক এবং তাঁর পরিবারেরই সদস্য। নিজের বিয়ের আসরে পশুদের আর্তনাদ শুনে বৈরাগ্য গ্রহণ করেছিলেন তিনি। রাজকীয় সাজ ত্যাগ করে তিনি গিরনার পর্বতে সাধনা শুরু করেন এবং সেখানেই মোক্ষ লাভ করেন। একইভাবে হিন্দুদের কাছেও গিরনার অত্যন্ত শ্রদ্ধার স্থান। এখানে অবস্থিত প্রাচীন অম্বা মাতা মন্দির একটি অন্যতম শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত। ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রতীক এই পাহাড়ে চড়া আজও শ্রদ্ধালুদের কাছে এক বিশেষ সাধনার অঙ্গ।
৩. শত্রুঞ্জয় পর্বত (পালিতানা, গুজরাত)
গুজরাতের পালিতানা শহরে অবস্থিত শত্রুঞ্জয় পর্বত বা ‘পুণ্ডরীক পর্বত’ জৈনদের প্রধান তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। বিশ্বাস করা হয়, প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এখানেও নির্বাণ লাভ করেছিলেন। তবে এই পর্বতের মাহাত্ম্য কেবল জৈন ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়; রামায়ণ ও মহাভারত যুগের সঙ্গেও এর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। শ্রীরামচন্দ্র, সীতা দেবী এবং পাণ্ডবদের এই পর্বতে আগমনের উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, ভগবান বিষ্ণু এখানে চতুর্ভুজ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই এর নাম পুণ্ডরীক পর্বত। বিশেষ করে নবরাত্রির মতো পবিত্র সময়ে এখানে ভক্তদের ঢল নামে।
৪. সম্মেদ শিখরজী (ঝাড়খণ্ড)
ঝাড়খণ্ডের গিরিডিহ জেলায় অবস্থিত সম্মেদ শিখর বা ‘শিখরজী’ জৈন সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ও পবিত্রতম তীর্থস্থল। এই পবিত্র শিখর থেকেই জৈন ধর্মের ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে ২০ জনই নির্বাণ লাভ করেছিলেন। এই পর্বতটি ‘পারসনাথ পর্বত’ নামেও সর্বজনবিদিত। তবে এর আধ্যাত্মিক আবেদন আরও ব্যাপক; স্থানীয় আদিবাসী সমাজ এই পর্বতকে ‘ঈশ্বরের মধুবন’ বলে সম্বোধন করে। তাঁদের কাছে এটি এক পরম পূজনীয় স্থান, যা ভারতের বৈচিত্র্যময় আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
৫. পাভাগঢ় পাহাড় (গুজরাত)
গুজরাতের পঞ্চমাহল জেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮২২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পাভাগড় পাহাড়। এই পাহাড়ের শীর্ষে রয়েছে বিখ্যাত কালিকা মাতার মন্দির, যা অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ হিসেবে স্বীকৃত। হাজার হাজার ভক্ত রোপওয়ে বা সিঁড়ি ভেঙে মায়ের দর্শনে এখানে আসেন। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানেরও অন্তর্ভুক্ত। তবে জৈন গ্রন্থ ‘নির্বাণ কাণ্ড’ অনুসারে, প্রাচীনকালে এই স্থানে মূলত দিগম্বর জৈন মন্দিরগুলিই প্রধান ছিল। ১৯ শতকের নানা প্রমাণেও এই পাহাড়ে জৈন সংস্কৃতির গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।