
১৯৯৩ সালের ৭ জানুয়ারি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাইটার্স অভিযান। তাঁর সঙ্গে মূক-বধির তরুণী, যিনি অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আর সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজন সিপিএম কর্মী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে অবিলম্বে দেখা করার দাবি জানান। কিন্তু জ্যোতিবাবু দেখা করতে চাননি এবং নাকি পিছনের দরজা দিয়ে ভবন ছেড়ে চলে যান। এরপরই তাঁর কক্ষের সামনে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ধর্নায় বসেন মমতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ভেবে দেখুন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। চরম ধস্তাধস্তির মধ্যে পুলিশ একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে একটি পুলিশ ভ্যানে তোলে এবং নিয়ে যাওয়া হয় লালবাজারের লকআপে।
ধর্মতলায় মেট্রো চ্যানেলে ধর্নায় বসতে চলেছেন মমতা
১৯৯৩ সালের মমতার সঙ্গে বর্তমানের মমতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্ট্র্যাটেজিতে কিন্তু বিশেষ বদল হয়নি। মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়! যে সব কর্মসূচি সাধারণত বিরোধীরা করে, সেই সব প্রতিবাদ এ রাজ্যে শাসকদলের নেত্রীও করেন। তিনি 'পজিশনেও আছে, অপোজিশনেও আছেন'। নিজেই একটি সাক্ষাত্কারে বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ অর্থাত্ শুক্রবারও ধর্মতলায় মেট্রো চ্যানেলে ধর্নায় বসতে চলেছেন মমতা। SIR-এ ফাইনাল ভোটার তালিকায় নাম বাদের প্রতিবাদে তৃণমূলনেত্রীর এই ধর্না। ওই বছরেই ২১ জুলাইয়ের ঘটনা আর নতুন করে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সেই ২১ জুলাইয়ের আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন যুব কংগ্রেসের তত্কালীন সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাদা চোখে দেখলে, আসলে কংগ্রেসের আন্দোলন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে যায় সেই আন্দোলন। তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পরে ২১ জুলাই শহিদ দিবসকে অন্য মাত্রা দিলেন মমতা। ফিকে হয়ে গেল কংগ্রেস। ২১ জুলাই ও তৃণমূল কংগ্রেস মিলেমিশে গেল।
২০০৮ সালে টানা ২৬ দিন অনশনে বসেছিলেন
সেই মেট্রো চ্যানেল, যেখানে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় ২০০৮ সালে টানা ২৬ দিন অনশনে বসেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেত্রী। আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আজও তিনি ধর্নায় বসছেন। এই সেই মেট্রো চ্যানেল, যেখানে ২০১৯ সালে তত্কালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে সিবিআই অভিযানের প্রতিবাদে গণতন্ত্র রক্ষার ডাক দিয়ে ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। এও এক আশ্চর্য রাজনীতি। বিরোধী ও শাসকদল গুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদা এমন এক ইমেজ বানিয়ে রাখেন, তা হল, তিনি মা দুর্গার রূপ, যিনি দিল্লির অসুরদের হাত থেকে সন্তানদের রক্ষা করছেন।
আজ ১৪ বছর হয়ে গেল কুর্সিতে রয়েছেন। তবু নিজেকে শাসকের আসনে সরাসরি বসাননি। বাংলার ভোটাররাই মাঝে মাঝে কনফিউশনে পড়ে যায়, আসলে শাসকের ভূমিকায় কে? দিল্লি নাকি দিদি? আর কনফিউশনটাই আসলে মমতার ক্যারিশমা। দেখুন, SIR ইস্যুতে যখন CEO দফতরের সামনে রাতভর ধর্না করলেন বামেরা, ঠিক তখনই মমতাও বসে পড়ছেন ধর্নায়। ইস্যু সেই SIR। মোদ্দা বিষয়, বাম, কংগ্রেসের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও নিশানায় সেই কমিশন।
সাদামাটা শাড়ি, হাওয়াই চটি ও বিরোধী নেত্রীর ইমেজ
সেই সাদামাটা শাড়ি, হাওয়াই চটি ও বিরোধী নেত্রীর ইমেজ। ঠিক যেমন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী থেকে মহাত্মা গান্ধী হওয়ার পরে যেমন তিনি চাইলেও হয়তো কোট প্যান্ট পরতে পারেননি। খাটো ধুতি, চটি ও খালি গা। এটাই ছিল তাঁর ইমেজ। যে ইমেজে গোটা দেশের মানুষ তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। তত্কালীন ভারতের গরিব, আধপেটা খাওয়া মানুষ মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিল।
কেন্দ্রের বঞ্চনাকে সফল ন্যারেটিভ বানিয়ে ফেললেন
এই তো সে দিনও, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। লোকসভার ভোটের মুখে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুদিনের ধর্নায় বসলেন। দাবি হল, কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পে রাজ্যকে টাকা দিচ্ছে না মোদী সরকার। লোকসভা ভোটের মুখে কেন্দ্রের বঞ্চনাকে সফল ন্যারেটিভ বানিয়ে ফেললেন।
অনেক সমালোচক বলেন, ২০১৯ সালে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে সিবিআই অভিযানের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না ছিল বাড়াবাড়ি। কিন্তু ইডি ও সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সি রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডায় মোদী সরকারের ব্যবহার করার যে অভিযোগ মমতা বারবার করেন, রাজীব কুমারের জন্য হোক বা I-PAC অফিসে ED-র হানা রুখতে মমতা ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসা, শহরাঞ্চল, বিশেষ করে তথাকথিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এই ঘটনার সমালোচনা করলেও, গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের মনে ইডি,সিবিআই-এর বিরুদ্ধে মমতার এই প্রতিবাদ কিন্তু ইতিবাচক দাগ কাটে। ওই যে বললাম, দিল্লির অসুরদের হাত থেকে বাংলার সন্তানদের বাঁচাচ্ছেন দিদি। হ্যাঁ, এটাই ইমেজ।
আজ যখন ধর্মতলায় মমতা ধর্নায় বসছেন, বাংলার মানুষের মনে তৈরি হবে ফের এক ইমোনশনাল বিভ্রান্তি। বাংলার শাসক কে? দিদি নাকি দিল্লি?