
নিতান্তই একটা কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে কিছুদিনের মধ্যে সেই আন্দোলনই হয়ে ওঠে রক্তক্ষয়ী। আর সেই উত্তপ্ত পরিবেশের মধ্যেই দেশ ছাড়তে হয় বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এবার কাট টু নেপাল। সেখানেও নিছক একটা জেন জি আন্দোলন শুরু হয়। তারপর সেই আন্দোলনেও তাজা রক্ত ঝরে। এই পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। আর এই দুই পরিস্থিতিতেই বারবার সামনে এসেছে ডিপ স্টেটের নাম। এই ডিপ স্টেটই নাকি আন্দোলনগুলির নেপথ্যে থেকেছে। করেছে সাহায্য।
কিন্তু প্রশ্ন হল ডিপ স্টেট কী? এটা কাজ করে কীভাবে? আসলে ডিপ স্টেট হল যে কোনও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বিরোধী যে পরিসর, তাকে আরও মজবুত করার জন্য বাইরে থেকে আর্থিক, মনস্তাত্বিক এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সাহায্য প্রদান করার প্রক্রিয়া। অন্যভাবে বলেন, কোনও দেশ বা রাজ্যের পরিস্থিতিকে ডি স্টেবিলাইজ বা অস্থির করে তোলার প্রক্রিয়াকে মদত দেওয়াকেই বলা যেতে পারে ডিপ স্টেট।
আমরা সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিপ স্টেটের খেলা দেখেছি। এক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেনি। গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক চিন্তাভাবনাও তাদের চক্ষুশূল। তাই সেই সব মৌলবাদীরা গোপনেই নিজেদের ঘুঁটি সাজিয়েছে। আর তাদের পিছন থেকে সব ধরনের সাহায্য করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ভারতকে চাপে রাখার জন্যই সরাসরি আর্থিকভাবে, মনস্তাত্বিকভাবে এবং প্রযুক্তিগতভাবে সাহায্য করেছে ডিপ স্টেটের মাধ্যমে।
ও দিকে নেপালের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। সেখানেও যে তথাকথিত জেন জি আন্দোলন সরকারকে উৎখাত করে দিয়েছে, তার পিছনেও ডিপ স্টেটেরই কারসাজি রয়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশ, নেপাল নয়, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই সব সময় ডিপ স্টেট কাজ করে চলেছে। পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলার জন্য একটা নেগেটিভ বা নঞর্থক শক্তি কাজ করছে। এই নেগেটিভ শক্তিকে ব্যবহার করে শত্রুদেশগুলি। তারা নিজেদের প্রয়োজনে ডিপ স্টেটের মাধ্যমে অশান্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়।
ভারতেও রয়েছে ডিপ স্টেট
ভারতের মতো দেশেও বিরাজ করছে ডিপ স্টেট। এমনকী প্রতিটি রাজ্যেও ডিপ স্টেট রয়েছে। যখন কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করতে পারে না, তখন তারা এই ডিপ স্টেট বা নেগেটিভ শক্তিকে পিছন থেকে মদত দেয়। এর মাধ্যমে অরাজক অবস্থা তৈরি করতে চায়। তাদের লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা দখল।
তাই এটা সহজেই বলা যায় যে ডিপ স্টেট এমন একটা ধারণা যেটা সারা বিশ্বে রয়েছে। ভারতে রয়েছে। ভারতের সব অঙ্গ রাজ্যেও রয়েছে। এমনকী প্রত্যেকটা জেলায় রয়েছে।
আসলে যারা সমাজবিরোধী, যারা অসামাজিক কাজ করে, তাদের নিজস্ব গোষ্ঠী রয়েছে। প্রয়োজনে তাদের আর্থিকভাবে, মনস্তাত্বিকভাবে এবং প্রযুক্তিগতভাবে সাহায্য করে কিছু গোষ্ঠী। যার ফলে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে।
বদলেছে গণআন্দোলন
আগে একটা গণ আন্দোলন হতো আদর্শগত কারণে। সেখানে আদর্শের উপর ভিত্তি করে হতো জমায়েত বা লড়াই। তবে বর্তমানে পরিস্থিতিটা একবারেই বদলে গিয়েছে। এখন গণ আন্দোলনকে কোনও দল, সংগঠন বা সংস্থার অধীনে থাকে না। সেটার বিস্তৃতি অনেক বেশি। আর এমনটা হওয়ার কারণ অবশ্যই ভার্চুয়াল।
আসলে এখন কথায় কথায় আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। দেখবেন হুট করেই কোনও একটা জায়গায় জমায়েত শুরু হয়ে গিয়েছে। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়াই হয়ে যায় জমায়েত। আর সেটা সম্ভব হয় ভার্চুয়ালের মাধ্যমে। অনলাইনের মাধ্যমেই গোটা বিষয়টা পরিচালনা হচ্ছে। তাই এটাকে ভার্চুয়াল ডিপ স্টেটও বলা যায়।
ভারতে ডিপ স্টেটের ভূমিকা কেন কম?
আমাদের দেশেও ডিপ স্টেট রয়েছে। তবে তারপরও এখানে সেভাবে কোনও গণআন্দোলন দানা বাঁধতে পারে না। আর এমনটা হওয়ার পিছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। আসলে ভারতে ডিপ স্টেট কার্যকর করতে পারে আমেরিকা, চিন ও রাশিয়া। তবে এই তিনটি দেশই নিজেদের স্বার্থেই সরাসরি ভারতকে অস্থির করতে চায় না।
আসলে ভারতের অর্থনীতি বিরাট। তাই আমাদের দেশকে অস্থির করলে, এখানে নৈরাজ্য তৈরি করলে তাদের দেশের অর্থনীতিও নড়ে যাবে। আর সেটা চিন, আমেরিকা বা রাশিয়া চায় না। এটাই হল সহজ হিসেব।
তবে আমেরিকা বা চিন, সরাসরি ভারতকে না আঘাত করেও আশপাশের দেশের মাধ্যমে সমস্যায় ফেলছে। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ভারতের একাধিক প্রতিবেশী দেশে যে এই অরাজকতা, সেটাও ডিপ স্টেটই করছে। এর ফলে আমাদের দেশকে এই সব প্রতিবেশীদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। আর এটাই চায় চিন এ আমেরিকা। তারা সরাসরি ভারতকে অশান্ত না করে এভাবেই সমস্যায় রেখে দিতে চায়।
মাথায় রাখতে হবে, ডিপ স্টেট চালানোর পিছনে অনেক টাকা, মেধা এবং প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। তাই কোনও রাষ্ট্র ডিপ স্টেটে বিনিয়োগের আগে নিজের স্বার্থের অঙ্কটা ভাল করে কষে নয়। তারপরই করে বিনিয়োগ।