
মৃত্যু। একটি ধ্রুব সত্য। এবং সেই মৃত্যু ঘিরেই অনেকের মুখোশ খুলে যায়। বাংলাদেশে গত সপ্তাহে দুটি মৃত্যু ঘিরে ঠিক এটাই ঘটল। পশ্চিমি দুনিয়ার পক্ষপাতিত্বের মুখোশটা আবার খুলে গেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলি ওসমান হাদির মৃত্যুতে যেভাবে শোকজ্ঞাপন করল, ঠিক একই ভাবে দীপু দাসের মৃত্যুতে আশ্চর্যরকম চুপ।
হাদি ও দীপু, দুটি হত্যাই অসভ্য সমাজের পরিচয়
দীপু দাস ও ওসমান হাদি, দুজনকেই যেভাবে খুন করা হয়েছে, তা যে কোনও সভ্য সমাজেই মধ্যযুগীয় বর্বরচিত। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় যিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন, সেই ওসমান হাদিকে ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় মুখোশধারী দুষ্কৃতী মাথায় গুলি করে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। ঠিক একই দিনে বাংলাদেশে এক হিন্দু কারখানা শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
হাদিকে দেওয়া হল নজরুলের সম্মান
ওসমান হাদি ছিলেন একজন জ্বালাময়ী বক্তা। তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে এক কট্টরপন্থী সংগঠনের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁর ভারত-বিরোধিতা ও শেখ হাসিনা-বিরোধী বক্তব্য ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানের সময়ে অনেকের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। মৃত্যুর পর তাঁকে বিশেষ সম্মান দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। যার নির্যাস, নজরুলের সম্মান দেওয়া হল হাদিকে।
দীপু দাসের হত্যা নিয়ে চুপ পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম
অন্যদিকে দীপু চন্দ্র দাসের জীবনের চেয়ে তাঁর মৃত্যুই যেন বেশি পরিচিত। কারখানার সুপারভাইজাররাই তাঁকে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেয়। সহকর্মীরাও সেই মারধরে যোগ দেয়। এখানেই থেমে থাকেনি তারা। পরে তাঁর নগ্ন দেহ রাস্তার মাঝখানে একটি গাছে বেঁধে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ২৭ বছরের দীপু ছিলেন কলেজ গ্র্যাজুয়েট, তিন বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, আর তাঁর দেড় বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমি দ্বিচারিতা
এই ভয়াবহ ঘটনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় প্রকাশ্যেই ঘটে। শত শত মানুষ সেই ঘটনার ভিডিও তুললেও কেউ বাধা দেয়নি। ভারত ছাড়া আর কোনও দেশ এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেনি। পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমগুলিও প্রায় নীরব ছিল। শুধু নিউ ইয়র্ক টাইমস খবরটি প্রকাশ করে, কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর বাড়তে থাকা হামলার প্রসঙ্গ না তুলে বিষয়টিকে ভারতের মুসলিম নিগ্রহের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে দেখিয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে যারা সব সময় বড় বড় কথা বলে, সেই পশ্চিমি দেশগুলিও দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার ঘটনায় নীরব থেকেছে। অথচ ইসলামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় তারা বিবৃতি দেয়, এমনকি কয়েকটি দূতাবাস ঢাকায় তাদের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে। প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক কনওয়াল সিবাল একে কূটনৈতিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছেই,মানবাধিকার কি পশ্চিমের কাছে সুবিধামতো ব্যবহারের বিষয়? দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডে তাদের নীরবতা সেই দ্বিচারিতারই স্পষ্ট উদাহরণ।