
আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) ঘোষণা করে তারা ভারতে কিছুতেই খেলতে আসবে না, অতএব টি-২০ বিশ্বকাপ বয়কট করছে তারা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈঠকের পর এদিন বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, 'ICC আমাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করেনি। তাই বাংলাদেশ ভারতে খেলার জন্য চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে না।'
আসিফ নজরুল একটি উস্কানিমূলক মন্তব্যও করেছেন এই মর্মে। তাঁর বক্তব্য, 'আমরা মাথা নত করব না। যদি বাংলাদেশ বিশ্বকাপ না খেলে, তাহলে বিশ্ববাসীর পরিণতি বুঝতে হবে। আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করতে পারি না।' এই অবস্থানের কারণে BCB ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) সঙ্গেও একপ্রকার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল।
ICC বাংলাদেশকে স্পষ্ট আল্টিমেটাম দিয়েছিল, টি-২০ বিশ্বকাপের ভেন্যু ভারতের বাইরে স্থানান্তরিত করা হবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও BCB তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। খেলোয়াড় এবং বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকের পরও ভারত সফর বয়কট করার সিদ্ধান্তে অনড় বাংলাদেশ।
অতীতের অনুগ্রহ ভুলেছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে ভারত এবং BCCI-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ এসব কিছুই ভুলে গিয়েছে। ১৯৯৮ সালে যখন বাংলাদেশ ICC-র পূর্ণ সদস্যও ছিল না, তখন তৎকালীণ ICC সভাপতি এবং প্রাক্তন BCCI প্রধান জগমোহন ডালমিয়া একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ICC নকআউট টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ইভেন্টটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সেই টুর্নামেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল। কিন্তু আসল জয় হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের।
বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালে ICC-র সহযোগী সদস্য হয় কিন্তু টেস্টে মর্যাদা পেতে ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড এবং তারপর পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকে চমকে দেয়। এই জয় তাদের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে। ভারত এবং BCCI-এর পক্ষ থেকে আবারও চূড়ান্ত সমর্থন মেলে। জগমোহন ডালমিয়া বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদার দাবিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাও এর পক্ষে ছিল। বিরোধিতা করেছিল ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। অবশেষে ২০০০ সালের জুনে ICC সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে টেস্টে মর্যাদা প্রদান করে।
ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট
২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তাদের অভিষেক টেস্ট ম্যাচটি খেলে। এই ম্যাচটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ঐতিহাসিক ছিল। কাকতালীয় ভাবে এটি ছিল অধিনায়ক হিসেবে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়েরও প্রথম টেস্ট। প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করে বাংলাদেশ দুর্দান্ত শুরু করেছিল। তবে অভিজ্ঞ ভারতীয় দল ৯ উইকেটে ম্যাচটি জিতেছিল। BCCI সর্বদাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলা হয়।
এখন যেহেতু বাংলাদেশ টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তাই ক্রিকেটমহলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট কি তার অতীত এবং ভারতের প্রতি তার সমর্থন ভুলে গিয়েছে? ICC, BCB এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের প্রভাব কেবল ক্রিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা সহজেই অনুমেয়। এর সরাসরি প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতেও পড়বে।