
এক সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই ছিল দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক কোড লেখা। আর তারপর হাজারো ভুল খুঁজে তা ঠিক করা। লক্ষ লক্ষ কোডারের অক্লান্ত পরিশ্রমেই আজকের এই ডিজিটাল দুনিয়া বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) আগ্রাসনে বদলে যাচ্ছে সেই চেনা ছবি। এই পরিস্থিতিতেই প্রোগ্রামারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা দিলেন স্যাম অল্টম্যান(Sam Altman)। ওপেনএআই-এর কর্তার সেই কমেন্টেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। তাহলে কি ধীরে ধীরে সেই কোডাররাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছেন? স্যাম অল্টম্যানের এক্স পোস্ট থেকে অন্তত এমনই ইঙ্গিত মিলছে।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি পোস্টে অল্টম্যান লিখেছেন, 'যাঁরা ক্যারেক্টার ধরে ধরে জটিল সফটওয়্যার লিখেছেন, তাঁদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। আজকের এই জায়গায় পৌঁছতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।'
AI যে আজকাল বেশ ভাল মানেরই কোড লিখে ফেলতে পারে এবং ত্রুটিও সংশোধন করতে পারে তা কারও অজানা নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এখনও সেই কোডিং সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। ইমপ্লিমেন্টেশনেরও একটা ব্যাপার আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, AI আসার ফলে প্রোগ্রামিংয়ের কাজের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। আগে যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এখন তা অনেক কম সময়ে সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে নতুনদের মধ্যে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে এন্ট্রি-লেভেলের কাজ, যেখানে সাধারণ কোডিং ধীরে ধীরে শেখা যেত, সেই জায়গাগুলিতে AI-র প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারদের ছোটখাটো কাজ করার মত দক্ষ AI হয়ে গিয়েছে। সেই সত্যিটা আর অস্বীকার করে লাভ নেই।
তবে সবাই যে এই পরিবর্তনকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। কলকাতারই একাধিক IT বিশেষজ্ঞ জানালেন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং মোটেও শেষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাঁদের মতে, AI সাধারণ কাজগুলির অটোমেশন করে দিচ্ছে। ফলে প্রোগ্রামাররা আরও দ্রুত কাজ সারতে পারছেন। তবে বড় সিস্টেম তৈরি, জটিল সমস্যা সমাধান, নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া; এই সব ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য।
অন্যদিকে, Anthropic-এর একটি সমীক্ষা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাদের AI মডেল Claude-এর ব্যবহার বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, কম্পিউটার ও গণিত সম্পর্কিত কাজে AI প্রায় ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৩৩ শতাংশের মতো। অর্থাৎ, AI-এর সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না।
সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে, কৃষিকাজ, নির্মাণ, পরিবহণ বা ব্যক্তিগত পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে AI-এর প্রভাব সীমিত। কারণ এই কাজগুলিতে শারীরিক উপস্থিতি ও মানবিক বিচারবুদ্ধির প্রয়োজন হয়। একইভাবে, আদালতে আইনজীবীর ভূমিকা বা জটিল মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও AI পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট। AI প্রোগ্রামিং জগতে বড় পরিবর্তন আনছে ঠিকই। তবে তা সম্পূর্ণভাবে মানব প্রোগ্রামারদের সরিয়ে দিচ্ছে না। বরং কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। অল্টম্যানের বার্তাও অনেকের মতে ‘বিদায়’ নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত। যেখানে AI ও মানুষ মিলেই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি তৈরি করবে।