
মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হতেই জলপাইগুড়ির রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। চার বারের বিধায়ক তথা রাজগঞ্জের ঘরের মানুষ খগেশ্বর রায়ের নাম প্রার্থী তালিকায় না থাকায় অভিমানে জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের সঙ্গী, যিনি বাম জমানাতেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন, তাঁর এমন প্রস্থান ঘিরে এখন সরগরম উত্তরবঙ্গ।
খগেশ্বর রায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, দল তাঁর চেয়ে ভালো নেতা হয়তো পাবে, কিন্তু তাঁর এই দীর্ঘ লড়াইয়ের কোনও মর্যাদা রক্ষা হলো না। প্রার্থী তালিকা দেখার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁর অনুগামীরা। তাঁদের বক্তব্য, যিনি কোনও দিন দল করলেন না, সেই অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে কেন রাজগঞ্জের মতো রাজনৈতিক ঘাঁটিতে প্রার্থী করা হলো? খগেশ্বরের বাড়ি ও দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুগামীদের বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ক্ষুব্ধ বিধায়ক ইতিমধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করতে অনুগামীদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন।
রাজগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এক সময় এটি ছিল বামেদের দুভেদ্য দুর্গ। ২০০১ ও ২০০৬ সালে পরাজিত হলেও ২০০৯ সালের উপনির্বাচনে ১৫ হাজার ভোটে জিতে সেখানে প্রথম জোড়ফুল ফুটিয়েছিলেন খগেশ্বর রায়। সেই থেকে টানা চার বার তিনি রাজগঞ্জকে আগলে রেখেছিলেন। খগেশ্বরের প্রশ্ন, "যিনি কোনও দিন দলটাই করলেন না, তাঁকে কেন প্রার্থী করা হলো?" তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে থাকা এক নেতার এই হাহাকার এখন রাজগঞ্জের প্রতিটি অলিতে-গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজগঞ্জ ছাড়াও জলপাইগুড়ি সদরেও এবার বড়সড় বদল এনেছে শাসকদল। বিদায়ী বিধায়ক প্রদীপকুমার বর্মাকে সরিয়ে সেখানে প্রার্থী করা হয়েছে কৃষ্ণ দাসকে। যদিও কৃষ্ণ দাস দলের এই সিদ্ধান্তে আপ্লুত। তিনি জানিয়েছেন, দল তাঁর ওপর ভরসা রাখায় তিনি কৃতজ্ঞ এবং জয়ী হয়ে মানুষের হয়ে কাজ করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তবে সদরের প্রার্থী বদল নিয়েও দলের নিচুতলায় মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
খগেশ্বর রায়ের এই ইস্তফা প্রসঙ্গে জেলা তৃণমূল সভাপতি মহুয়া গোপ রীতিমতো রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে জানিয়েছেন, খগেশ্বরবাবুর মতো চার বারের বিধায়ক প্রার্থী হচ্ছেন না, এই খবর তাঁর কাছেও ছিল না। দলের এই সিদ্ধান্তে তিনি নিজেও কিছুটা অবাক। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি শীঘ্রই খগেশ্বর রায়ের সঙ্গে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও ক্ষুব্ধ বিধায়কের বরফ তাতে কতটা গলবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
এশিয়ার সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মন বর্তমানে বাবার অসুস্থতার কারণে জলপাইগুড়ির বাইরে রয়েছেন। তাই তাঁর নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে তাঁর মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক ময়দানে নামানোর তৃণমূলের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় কি না, এখন সেটাই দেখার। কারণ রাজগঞ্জের মতো এলাকায় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার বদলে একজন খেলোয়াড়কে মেনে নিতে সাধারণ কর্মীদের একাংশ বেশ নারাজ।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণভেরি বাজার আগেই জলপাইগুড়িতে শাসকদলের অন্দরের কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এল। খগেশ্বর রায় কি নির্দল হিসেবে দাঁড়াবেন নাকি অন্য কোনও পথে হাঁটবেন, তা নিয়েই এখন জল্পনা তুঙ্গে। উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে তৃণমূলের নতুন ও পুরনো শিবিরের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজগঞ্জের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।