
২০২৬-এর বিধানসভা ভোট ঘোষণা হয়নি। SIR-এর শুনানির শেষে এখনও চূড়ান্ত ভোটার তালিকাও প্রকাশিত হয়নি। তবে এরইমধ্যে রাজ্যে পরপর বোমা, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রশাসনের। বোলপুর থানার অন্তর্গত নানুর বিধানসভার সিয়ান গ্রামে ক্যানেলপাড়ে প্রায় ১০টি তাজা বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয়রা সন্দেহজনক বস্তু নজরে পড়তেই পুলিশে খবর যায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিশাল পুলিশবাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বোম স্কোয়াড এসে উদ্ধার হওয়া বোমাগুলি নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু করে।
প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল স্থানীয় দুষ্কৃতীদের মজুত করা বিস্ফোরক, না কি ভোটের আগে বৃহত্তর কোনও অশুভ পরিকল্পনার ইঙ্গিত। বোলপুর থানার আওতাধীন নানুর বিধানসভার সিয়ান গ্রাম সাধারণত কৃষিনির্ভর ও শান্ত এলাকা হিসেবেই পরিচিত। ক্যানেলপাড়ে হঠাৎ করে একসঙ্গে এতগুলি তাজা বোমা মজুত থাকার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই গ্রামবাসীদের আতঙ্কিত করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বোমাগুলি কাপড়ে মোড়া অবস্থায় পড়েছিল। প্রাথমিকভাবে সেগুলি দেশি তৈরি সকেট বোমা বা তাজা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED) হতে পারে বলে অনুমান। যদিও ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। একটি বা দুটি বোমা উদ্ধার হওয়া নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু একসঙ্গে প্রায় ১০টি তাজা বোমা উদ্ধার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জিহাদি প্ল্যান’-এর মতো কোনও তত্ত্ব সমর্থন করেনি। তবে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে বোমা উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। গ্রামীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশি বোমা ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষত পঞ্চায়েত বা বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, এলাকা দখল বা ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগে অতীতে বহুবার বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি ‘লোকাল ম্যানুফ্যাকচারড’ বোমা—যা সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। উদ্দেশ্য সাধারণত প্রাণহানি নয়, বরং আতঙ্ক সৃষ্টি। তবে ভুল হাতে পড়লে বা ভুল সময়ে বিস্ফোরণ ঘটলে প্রাণঘাতী হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঘটনার পরপরই কিছু মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এ কি কোনও বৃহত্তর জঙ্গি পরিকল্পনার অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা জরুরি— উদ্ধার হওয়া বোমার প্রকৃতি কী? এর সঙ্গে কোনও পরিচিত জঙ্গি সংগঠনের যোগসূত্র মিলেছে কি? আর্থিক বা ডিজিটাল যোগাযোগের প্রমাণ রয়েছে কি? এখনও পর্যন্ত পুলিশ এমন কোনও আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য জিহাদি নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে শুধুমাত্র বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে ‘জিহাদি প্ল্যান’ বলে আখ্যা দেওয়া তদন্তের আগে অতি-সরলীকরণ হতে পারে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় বীরভূমকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত ভাবারও সুযোগ নেই।
বীরভূমের ভৌগোলিক অবস্থান একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ঝাড়খণ্ডের নিকটবর্তীতা, আন্তঃজেলা সড়ক সংযোগ এবং গ্রামীণ বিস্তীর্ণ এলাকা—সব মিলিয়ে নজরদারির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অতীতে বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরক মজুতের ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে সিয়ান গ্রামের ঘটনা প্রশাসনের কাছে সতর্কবার্তা হিসেবেই ধরা হচ্ছে। ঘটনার পরই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ-এর বিশাল বাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে। বোম স্কোয়াড ডেকে এনে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে— এলাকা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সন্দেহভাজন দুষ্কৃতীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংঘাত বা শত্রুতার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া গোয়েন্দা শাখাও সক্রিয় হয়েছে। ফোন কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন ও সোশ্যাল মিডিয়া নজরদারির মাধ্যমে সূত্র খোঁজা হচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকায় বোমা উদ্ধারের ঘটনা দ্রুত গুজবের জন্ম দেয়। 'জিহাদি প্ল্যান', 'বড় নাশকতা', 'ভোটে রক্তারক্তি'—এইসব শব্দ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, আতঙ্কের পরিবেশ রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে। গুজব ছড়ালে সামাজিক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু দোষী ধরাই নয়, তথ্যভিত্তিক স্বচ্ছ বার্তা পৌঁছে দেওয়া। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি, ফ্ল্যাগ মার্চ, সংবেদনশীল বুথ চিহ্নিতকরণ—এইসব পদক্ষেপ সাধারণত নেওয়া হয়। নানুর বিধানসভা এলাকাকে কি ‘সেনসিটিভ’ তালিকায় তোলা হবে? প্রশাসনিক মহলে সেই আলোচনাও শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
সম্ভাব্য তিনটি তত্ত্ব ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা তিনটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন—স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গ্রামীণ এলাকায় প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে বোমা মজুত। অপরাধচক্রের কার্যকলাপের আওতায় বোমা অন্যত্র সরানোর আগে সাময়িকভাবে মজুত ছিল। বৃহত্তর নাশকতার ছক এবং ভোটের সময় বড়সড় আতঙ্ক সৃষ্টির পরিকল্পনা। তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে কোন তত্ত্ব বাস্তবের কাছাকাছি।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিজ্ঞ মহল বলছে, কেবল উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করাই যথেষ্ট নয়—উৎস ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। বোলপুরের সিয়ান গ্রামের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে। কিন্তু তদন্তের আগে ‘জিহাদি প্ল্যান’ তকমা দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনই ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক নয়। ভোটের আগে বিস্ফোরক উদ্ধার রাজনীতির উত্তাপ বাড়ায়। তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত তদন্ত ও কড়া নজরদারি পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে পারে। বোলপুর যেন আতঙ্কের প্রতীক না হয়ে ওঠে—সেটাই এখন প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যৌথ প্রত্যাশা। পরবর্তী কয়েকদিনের তদন্তই বলবে, সিয়ান গ্রামের ক্যানেলপাড়ে মজুত ওই ১০টি বোমা কেবল স্থানীয় দুষ্কৃতীর চক্রান্ত ছিল, নাকি তার পেছনে লুকিয়ে ছিল বড় কোনও অশুভ ছক।
রিপোর্টারঃ শান্তনু হাজরা