
রাজ্যপাল হিসেবে সিভি আনন্দ বোসের পদত্যাগের ঘটনায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। এই পদত্যাগ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নির্বাচনের আগে রাজ্যপালের উপর কোনও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলছে তৃণমূল শিবির। ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বোস। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের নভেম্বর মাসে। অর্থাৎ প্রায় কুড়ি মাস আগেই তিনি পদ ছাড়লেন। ঠিক কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একাধিক বিষয়ে সরব ছিলেন সিভি আনন্দ বোস। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেন তিনি। তাঁর আমলে একাধিক ইস্যুতে রাজ্য সরকার ও রাজ্যপালের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের সম্পর্ক বহু ক্ষেত্রেই টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ। যা রাজনীতির অন্দরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
নিয়েছিলেন হাতেখড়ি
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হওয়ার পরেই নিয়েছিলেন হাতেখড়ি। বাংলা, বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ-ভালবাসা দেখিয়েছিলেন। এমনকি SIR আবহে বাংলার ভোটারও হয়েছিলেন প্রথম নাগরিক। রাজ্যপালের কথায়, 'এই বাংলার দত্তক সন্তান হতে চাই। রবীন্দ্রনাথ যে হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন। সেই বাংলায় আমি ভোটার হতে চাই। আমার পদবী বোস। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র ও বোস আমি মানসিক, সাংস্কৃতিক ভাবে বাংলার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই।' চলতি বছরই চৌরঙ্গী বিধানসভার ভোটার হয়েছিলেন। সিভি আনন্দ বোস যখন বাংলার রাজ্যপাল হয়ে এসেছিলেন, তখনই তিনি স্পষ্ট করেছিলেন বাংলা ভাষাটাকে ঠিক কতটা ভালবাসেন। কতটা নেতাজির আদর্শ মেনে চলেন। বাংলা শিখতেই উদ্যোগী ছিলেন তিনি। সরস্বতী পুজোয় রাজভবনে ‘হাতেখড়ি’ও হয়েছিল তাঁর। বাংলায় বই লেখার ইচ্ছাপ্রকাশও করতে দেখা যায় তাঁকে। জগদীপ ধনখড় পর্ব শেষ হতে বোসের জমনার একেবারের শুরুর দিকে রাজনৈতিক মহল মনে করেছিল, অন্ততপক্ষে এই রাজ্যপালের পর্বে হয়তো রাজভবন-রাজ্য সদ্ভাব বজায় থাকবে। পরবর্তীতে সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে। রাজনৈতিক মহলের কথায়, একাধিক ঘাত প্রতিঘাতে বর্তমানে সে সম্পর্ক কার্যত তলানিতে ঠেকেছিল।
'খুব ভাল হয়েছে'
কিছুদিন আগে সাধারণ মানুষের সঙ্গে জনসংযোগের জন্য একাধিক গ্রামে গিয়েছিলেন রাজ্যপাল বোস। সেইসময় ছোলা সেদ্ধ ও চপ খেয়ে দোকানদারকে বাংলায় বলেন, 'খুব ভাল হয়েছে।' তাঁর পদবী বোস হওয়ার পিছনেও বাংলা যোগ রয়েছে। রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিভি আনন্দ বোস জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী। বাংলার এই বীর সন্তানকে শ্রদ্ধা জানাতেই সন্তানদের নামের সঙ্গে বোস পদবী জুড়ে দিয়েছিলেন সিভি আনন্দের বাবা।
পশ্চিমবঙ্গে নানা ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল রাজ্যপাল বোসকে। সরাসরি রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাত শুরু করেছিলেন। এদিকে তাঁকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। রাজ্যপালের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগও উঠেছিল। হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন রাজভবনের এক মহিলা অস্থায়ী কর্মী। ঘটনাকে ঘিরে শোরগোল পড়ে যায়। যদিও রাজ্যপাল নিজে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। রাজভবনে নিজের হাতেই নিজের মূর্তির উদ্বোধন করে আরও এক বিতর্ক উস্কে দিয়েছিলেন বোস।
নিজের জমানায় পশ্চিমবঙ্গের রাজভবনের নামও বদলে দিয়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস। ‘রাজভবন’কে করা হয় ‘লোকভবন’। কেবলমাত্র কলকাতা নয়, দার্জলিঙের রাজভবনকেও লোকভবন করা হয়। লোকভবনের দক্ষিণ পশ্চিম গেটের নাম সাহিত্য সম্রাটের নামে করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লোকভবনের দক্ষিণ পশ্চিম গেটের নাম হল ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
সিভি আনন্দ বোস রাজ্যপাল হওয়ার পর, বিভিন্ন ইস্যুতে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সংঘাত সপ্তমে পৌঁছেছিল। হিংসা থেকে দুর্নীতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন তিনি। আবার বিভিন্ন ইস্যুতে রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রাজ্য বিজেপির নেতারাও। এই আবহে প্রশ্ন উঠছে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে আচমকা তাঁর পদত্যাগের কারণ কী? ১৯৫১ সালের ২ জানুয়ারি সি ভি আনন্দ বোসের জন্ম কেরলের কোট্টায়ামে। রাজ্য়পাল হওয়ার আগে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কেরলের মুখ্যমন্ত্রীর সচিব হিসাবে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও কেরল সরকারের বিভিন্ন দফতরের প্রধান সচিব হিসাবেও দায়িত্ব সামলান।
প্রশ্ন উঠছে, বৃহস্পতিবার কেন ইস্তফা দিলেন বোস? অনেকে মনে করছেন, বোসের এই ইস্তফা পূর্ব পরিকল্পিত নয়, বরং ‘আচমকা’। তিনি নিজেও নাকি প্রস্তুত ছিলেন না ইস্তফার জন্য। মাঝেমধ্যেই তিনি দিল্লি যেতেন। বৃহস্পতিবার সেই দিল্লিতে বসেই আচমকা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। অনেকে মনে করছেন, নেপথ্যে থাকতে পারে কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপির ‘চাপ’। তবে বোস নিজে এই নিয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।