
একুশের নির্বাচনের 'মুখ' কারা? দল-বল নির্বিশেষে এ প্রশ্ন রাখা হলে এখন উত্তর আসবে একটাই 'মনীষীরা'। যে মনীষীরা নিজেদের জীবনে রাজনীতির প্রাঙ্গন থেকে শতহস্তে দূরে ছিলেন একুশের রাজনীতিতে তাঁরাই এখন শাসক-বিরোধী শিবিরের প্রধান 'মুখ'। আসলে সংস্কৃতি-রুচি বাঙালির চিরকালের পছন্দের বিষয়। তাই বাঙালির গর্বের স্থানটিকে আরও 'এক্সপোজ' করে যদি বাড়তি অনুভূতি আদায় করা যায়, তাতে ক্ষতি কী!
সূত্রপাত কিন্তু বিধানসভা নির্বাচন নয়। দেশে দ্বিতীয়বারের জন্য এবং বাংলায় প্রথমবারের জন্য পসার বাড়াতে তৎপর মোদী-শাহ বঙ্গ জয়ে হাতিয়ার করেছিলেন মনীষীদের। লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ইস্যু নিয়ে বিজেপি-তৃণমূল 'মনীষী যুদ্ধ' শুরু। এরপর বিরসা মুন্ডা, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর এখন নেতাজি। বঙ্গ জয় করতে মনীষীদের ব্র্যান্ডিংকেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে চাইছেন মমতা থেকে মোদী।
বিধানসভা নির্বাচনে মঙ্গলবার উঠে এলেন 'নেতাজি'। সামনেই ২৩ জানুয়ারি। নেতাজির জন্মদিন। ভোটের মুখে এমন সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ২৩ জানুয়ারি দিনটিকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় সরকার। নাম নেপথ্যে যে অন্য 'হিসেব' লুকিয়ে আছে তা বুঝতে পারলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। পুরুলিয়ার সভা থেকে সাফ জানালেন, কেন্দ্রের এহেন 'পরাক্রমে' তিনি অখুশি। বরং 'দেশনায়ক' নামেই নেতাজির মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়। যদিও তিনি বলেছেন, "কেন্দ্র দিনটি পালন করতে যে শব্দ ঘোষণা করেছে, আমরা খুশি নই। পরিবারের (নেতাজির) সদস্যদের অনেকেও খুশি নন বলে জেনেছি। আমি এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না, এ নিয়ে রাজনীতিও করতে চাই না।”
এদিকে, বাংলায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্মদিন পালন করতে ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, নেতাজির নামে রাজ্যে মনুমেন্ট করা হবে। যার নাম হবে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ মনুমেন্ট। এছাড়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘তরুণের স্বপ্ন’ বইটি সব ভাষায় অনুবাদ করার কথা বলেছেন তিনি৷ নেতাজির ‘জয় হিন্দ বাহিনী’–র যে সব গান ছিল সেগুলি নিয়ে একটি গানের অ্যালবাম করারও প্রস্তাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷
অন্যদিকে, 'পরাক্রমী'কে জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতে মঙ্গলবারই হাওড়া-কালকা মেলের নাম নেতাজি এক্সপ্রেস করার সিদ্ধান্ত নিল ভারতীয় রেলওয়ে। ভারতবর্ষের অন্যতম পুরনো এক্সপ্রেস ট্রেনকে নেতাজির নামে উৎসর্গ করল কেন্দ্র। রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল টুইট করে লেখেন, ১৯৪১ সালে এই হাওড়া-কালকা মেলে চেপেই বিহারের গোমো থেকে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন নেতাজি। তাই এই ভাবনা।
রাজনীতিকদের এবং দলগুলির নির্দিষ্ট ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন (ইউএসপি) থাকে। তাই কোন সময়ে কোন মহাপুরুষকে সামনে রাখলে মোক্ষম লাভ হতে পারে তা তাঁরা ভাল করেই জানে। কোন সময় শান্তিনিকেতনী ভাবনা, কোন সময় বিদ্যাসাগরীয়, আবার কোন সময় সুভাষকে ভাষণে আনবেন পোড় খাওয়া রাজনীতিকরা তা সুচারুভাবেই জানেন। অতএব রুচিশীল বাঙালির অনুভূতিকে ধরতে নেতাজির ১২৫ তম জন্মদিন 'ভরসা' বিজেপি-তৃণমূল যুযুধান দুই পক্ষের। যদিও তৃণমূল সুপ্রিমো কিন্তু সাফ সাফ জানিয়েছেন, বিধানসভা ভোটের জন্যই নেতাজিকে ব্যবহার করছে বিজেপি।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই যদি ধরা হয়, তাহলে দেখা যায় নেতাজির জন্মদিন পালন হলেও সুভাষচন্দ্র বোসকে নিয়ে রাজনীতি কিন্তু এর আগে হয়নি বাংলায়। তবে কি বিজেপির নেতাজি-প্রীতি শুরু হতেই পাল্টা ময়দানে নেমেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো? নেতাজির ভাবনায় তৈরি ফরয়ার্ড ব্লক ছিল 'বাম মনস্ক'। তাই কি এতদিন অনীহা ছিল মমতার? এদিকে বিজেপি যেভাবে মনীষী রাজনীতি শুরু করেছে, সেখানে মাঠে নামতেই হবে। যদিও কেন্দ্র এবং মমতার দুজনের এহেন নেতাজি রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেছে ফরওয়ার্ড ব্লক।
মোদ্দা বিষয় হল, বাঙালির গর্বের জায়গা হল এই মনীষী-মহাপুরুষরা। গর্ব করার অধিকারও আছে বাঙালির। অনেকক্ষেত্রে ব্যবহারও করে। কিন্তু রাজনীতিতে এই উপসর্গ হাল আমলের। কুর্সি দখলের লড়াইয়ে যেভাবে মনীষীদের ব্যবহার করে অনুভূতির ব্র্যান্ডিং চলছে, সংস্কৃতিবান ব্যক্তিদের কাছে তা অধোগতি। সুভাষচন্দ্র বোস স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, মসনদে ক্ষমতায় আসতে চাওয়া দলীয় রাজনীতির অধীন হতে তিনি চাননি। জন্মদিনে এমন 'পরাধীন' উপহার নেতাজিকে গ্রহণ করানো হবে, বাঙালি গ্রহণ করবে কি?