
বেলডাঙা কাণ্ডে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে তদন্তে নামল এনআইএ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ পেতেই শনিবার সকালে মুর্শিদাবাদে পৌঁছেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) একটি দল। ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় যে অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তারই পূর্ণাঙ্গ তদন্তভার এবার এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, সাত থেকে আট সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। শনিবারই বেলডাঙা থানায় গিয়ে কেস ডায়েরি সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করার কথা তাঁদের। কোনও ভারত বিরোধী শক্তি ওই অশান্তির পেছনে ছিল কী না, তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
সপ্তাহখানেক আগে ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে বেলডাঙা এলাকা। মৃতের নাম আলাউদ্দিন শেখ (৩৭)। তিনি বেলডাঙার সুজাপুর-কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় ছিলেন ফেরিওয়ালা। কাজের সূত্রে তিনি ঝাড়খণ্ডে গিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁর ঘর থেকে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় বলে পরিবারকে জানানো হয়।
তবে পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়। তাঁদের অভিযোগ, আলাউদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে মারধর করে খুন করা হয়েছে এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আরও অভিযোগ ওঠে, পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর বেলডাঙার সুজাপুর–কুমারপুর এলাকায় শুরু হয় টানা বিক্ষোভ। জাতীয় সড়ক অবরোধ, রেল রোকো কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্দোলন ধীরে ধীরে হিংসাত্মক রূপ নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী, কিন্তু তাতেও উত্তেজনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পথ অবরোধ, ভাঙচুর, ট্রেন থামিয়ে বিক্ষোভ, সব মিলিয়ে অশান্তির একাধিক ছবি সামনে আসে।
পরপর দু’দিন আক্রান্ত হন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও। শেষ পর্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নেয় পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে দোষীদের চিহ্নিত করে একে একে গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে একজন মিম দলের নেতাও রয়েছেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও দায়ের হয়। প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, বেলডাঙা কাণ্ডে এনআইএ তদন্ত হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেন্দ্রীয় সরকারেরই রয়েছে। পাশাপাশি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত।
প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, মুর্শিদাবাদে ধারাবাহিকভাবে হিংসার ঘটনা ঘটছে, যা থেকে স্পষ্ট যে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় আদালতের তরফে।
হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণের কয়েক দিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে শুক্রবার বেলডাঙার অশান্তির তদন্তভার আনুষ্ঠানিকভাবে এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয়। এখন এই ঘটনার নেপথ্যে কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, এনআইএ তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে সবার।