
পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে, এমন জল্পনা রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খেলেও বিজেপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এমন কোনও পরিস্থিতি চায় না। দলের দাবি, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে এবং সেই নির্বাচন জয়ের ব্যাপারে বিজেপি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
দলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, 'রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমি মনে করি না। আমরা নিশ্চিত, নির্বাচন সময়মতো হবে এবং বিজেপি এই নির্বাচনে জিতবে।'
সম্প্রতি আর.এন. রবিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এই নিয়োগের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়, নির্বাচনের আগে কেন্দ্র কি রাষ্ট্রপতি শাসনের পথেই এগোতে পারে? অনেকেই মনে করছেন, তুলনামূলকভাবে কঠোর প্রশাসনিক ভাবমূর্তির একজন ব্যক্তিকে রাজ্যপাল করা হলে তার পেছনে রাজনৈতিক ইঙ্গিত থাকতে পারে। বিশেষত এসআইআর প্রক্রিয়া ও বিচারাধীন মামলাগুলি সময়মতো শেষ না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই কেন্দ্র আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বিজেপি নেতাদের দাবি, এমন কোনও পদক্ষেপ উল্টে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই রাজনৈতিক সুবিধা করে দিতে পারে। দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, 'নির্বাচনের আগে যদি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় বা কোনও ধরনের কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ হয়, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভুক্তভোগীর রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে যাবেন। আমরা সেই সুযোগ দিতে চাই না।'
বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি শাসনের বিষয়টি মূলত তৃণমূল কংগ্রেসই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সামনে আনছে এবং নতুন রাজ্যপাল নিয়োগের সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করে প্রচার চালাচ্ছে।
এদিকে রাজ্যপাল পরিবর্তন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, সি.ভি. আনন্দ বোসের পদত্যাগের খবর এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বার্তায় তিনি 'মর্মাহত এবং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।'
বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, শাসকদল মূলত নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। ৯ মার্চ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিজেপির একটি বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে এই বিষয়গুলি তোলা হবে। একই সময়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারও ৮ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসবেন।
তবে বিজেপির ভেতরেও কিছু নেতা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ কংগ্রেস এবং সিপিএম দাবি তুলেছে, প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের মামলা এখনও বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং সেই বিষয়গুলির নিষ্পত্তি না করে নির্বাচন করা উচিত নয়।
কলকাতার এক বিজেপি নেতা বলেন, 'দলের শীর্ষ নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতি শাসন চাইছে না ঠিকই, কিন্তু যদি এই বিপুল সংখ্যক মামলার নিষ্পত্তি নির্বাচনের আগে না হয়, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে, সেটাও একটা প্রশ্ন।'
তবে অন্য এক নেতা এই আশঙ্কা খারিজ করে বলেন, ইতিমধ্যেই প্রায় সাত লক্ষ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগেই বাকি মামলাগুলিও শেষ করার জন্য এখনও যথেষ্ট সময় রয়েছে। তাঁর মতে, সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই এগোবে এবং নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ধর্না কর্মসূচি নিয়েও বিজেপি খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। দলের মতে, এসআইআর ইস্যু একা তৃণমূলকে নির্বাচনে বড় সুবিধা দিতে পারবে না। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার কটাক্ষ করে বলেন, 'বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রীকে তো বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় থাকতে হবে। মনে হচ্ছে তিনি এখন থেকেই সেই ভূমিকার মহড়া দিচ্ছেন।'
অন্যদিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে এসআইআর আন্দোলনের গুরুত্ব খাটো করে দেখাচ্ছে। তাদের মতে, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া থেকে শুরু করে রাস্তায় নেমে আন্দোলন, সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করতে পেরেছেন যে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাঙালি ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি শাসনের ক্ষেত্রেও একাধিক ব্যবস্থা থাকতে পারে। রাষ্ট্রপতি শাসনের সময় দুটি সম্ভাবনা থাকে। এক, রাজ্যপালের নেতৃত্বে সরাসরি কেন্দ্রের শাসন চলতে পারে। দুই, রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাখা যেতে পারে।