
রাজ্য জুড়ে আবাস যোজনাকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগের মাঝেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াল। 'বাংলার বাড়ি' প্রকল্পের আওতায় ঘর পাওয়ার পর বেনিফিসিয়ারিদের কাছ থেকে কাটমানি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের প্রতিবাদ করতেই হামলার শিকার হলেন আইএসএফের মগরাহাট ব্লকের নেতা আজিজ আল হাসান। অভিযোগ, কাটমানির বিরোধিতা করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশে অভিযোগ জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি, উল্টে অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের ‘ঘনিষ্ঠতা’ নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। প্রতিবাদে আইএসএফ কর্মীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। গোটা ঘটনায় শাসক দল, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে এসেছে।
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের বিভিন্ন জেলার উপভোক্তাদের প্রথম কিস্তির টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে। বহু দরিদ্র পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্ন দেখছিল—নিজের মাথার উপর পাকাঘর—তা বাস্তবায়নের পথে প্রথম ধাপ পেরিয়েছে। কিন্তু সেই খুশির মধ্যেই অভিযোগ উঠছে, একাংশের কাছ থেকে বেআইনি ভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট ব্লকের সংগ্রামপুর এলাকাতেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ঘরের প্রথম কিস্তির টাকা পাওয়ার পর থেকেই এলাকার কিছু তৃণমূল নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠরা টাকা দাবি করছেন। বলা হচ্ছে, “টাকা না দিলে ঘর হবে না”, কিংবা “পরের কিস্তি আটকে যাবে”।
এই ঘটনার খবর পেয়ে প্রতিবাদে মুখ খোলেন আইএসএফের মগরাহাট ব্লক নেতা আজিজ আল হাসান। তাঁর দাবি, তিনি এলাকার মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে বলেন—আবাস যোজনার ঘর পাওয়ার জন্য কাউকে এক টাকাও কাটমানি দেওয়া উচিত নয়। এমনকি তিনি দলীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির বক্তব্যের কথাও তুলে ধরেন, যেখানে তাঁরা প্রকাশ্যে কাটমানির বিরোধিতা করেছেন। আজিজ আল হাসানের অভিযোগ, “আমি শুধু বলেছিলাম—মমতা ব্যানার্জির, অভিষেক ব্যানার্জি নিজেরাই বলেছেন, আবাস যোজনায় কোনও কাটমানি নয়। সেই কথাই বলার অপরাধে আমার উপর হামলা চালানো হয়েছে।”
অভিযোগ অনুযায়ী, মগরাহাট থানার সংগ্রামপুর এলাকায় তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। স্থানীয়রা কোনওমতে তাঁকে উদ্ধার করেন। হামলার পর আহত অবস্থায় আজিজ আল হাসান থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন। এলাকায় অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ।
আজিজ আল হাসানের কথায়, “আমি কোনও অন্যায় করিনি। শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। অথচ তার শাস্তি আমাকে পেতে হল।” এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। আইএসএফ নেতার দাবি, থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও এখনও পর্যন্ত কোনও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। উল্টে পুলিশ অভিযুক্তদের সঙ্গে ‘চা খাচ্ছে’—এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে। আজিজ আল হাসান বলেন, “আমি থানায় অভিযোগ করেছি। কিন্তু পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বরং অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের মেলামেশা দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের অভিযোগ গুরুত্বই পাচ্ছে না।”
এই অভিযোগ ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন—যদি পুলিশই নিরপেক্ষ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে ও হামলার প্রতিবাদে আইএসএফ কর্মীরা রাস্তায় নামেন। মগরাহাট স্টেশন রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয়। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শাসক দলের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে—‘কাটমানি বন্ধ করো’, ‘দোষীদের গ্রেফতার করো’। দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা অবরোধের ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এই বিক্ষোভে সামিল হন। তাঁদের বক্তব্য, আবাস যোজনার মতো প্রকল্পে কাটমানির অভিযোগ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
আইএসএফ নেতৃত্বের অভিযোগ, আবাস যোজনার মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে শাসক দলের একাংশ নিজেদের আয়ের উৎসে পরিণত করেছে। তাঁরা দাবি করেন, মগরাহাটের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকেই এমন অভিযোগ সামনে আসছে। আইএসএফের এক নেতা বলেন, “গরিব মানুষের ঘরের টাকা লুট করা হচ্ছে। যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।”
যদিও এই ঘটনায় স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, দলের একাংশের দাবি—এগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ। তাঁদের বক্তব্য, আবাস যোজনার টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে, কাটমানির কোনও প্রশ্নই নেই। তবে স্থানীয় স্তরে তৃণমূলের এই নীরবতা আরও প্রশ্ন তৈরি করছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
উল্লেখ্য, আবাস যোজনা নিয়ে কাটমানির অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও একাধিকবার এই প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে কাটমানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবুও মাঠপর্যায়ে অভিযোগ থামছে না বলেই দাবি বিরোধীদের। মগরাহাটের ঘটনা সেই পুরনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনে দিল।
এই ঘটনার পর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—যদি প্রকল্পটি গরিবের জন্য হয়, তাহলে টাকা চাওয়া হচ্ছে কেন? আর যদি কেউ প্রতিবাদ করে, তাকে মারধর করা হয় কেন? এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, “আমরা রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু ঘরের টাকা নিয়ে মারধর—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
মগরাহাটের সংগ্রামপুরে ISF নেতার উপর হামলার ঘটনা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়। এটি আবাস যোজনার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কাটমানির অভিযোগ সত্যি হলে যেমন কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন, তেমনই প্রতিবাদকারীদের উপর হামলা হলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ানক। এখন দেখার—পুলিশ আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত করে কি না, দোষীরা শাস্তি পায় কি না। এই ঘটনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে শুধু মগরাহাট নয়, গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনাই।