
ভোর হতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। একের পর এক বাড়িতে কাজ। ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, রান্নাঘরের সাহায্য। দিন শেষ হতে হতে অনেক সময় রাত গড়িয়ে যায়। এটাই তাঁদের প্রতিদিনের জীবন। চলতি কথায় তাঁরা ‘কাজের লোক’, পোশাকি ভাষায় ‘গৃহপরিচারিকা’।
রাজ্যে প্রায় ১০ লক্ষ গৃহপরিচারক-পরিচারিকা রয়েছেন বলে দাবি সংগঠনগুলির। বহুদিন ধরেই তাঁদের শ্রমিকের স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে। রাজ্য শ্রম দফতর আইনি স্বীকৃতির কথাও জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি এখনও অধরাই। সাম্প্রতিক বাজেটেও তাঁদের জন্য কোনও ঘোষণা না থাকায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
বাম আমল থেকেই সিপিএম, এসইউসিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক-সহ একাধিক দলের শ্রমিক সংগঠন গৃহশ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠনের আবেদন জানিয়েছিল। অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত অনেক সংগঠনকে রেজিস্ট্রেশনও দেওয়া হয়নি।
টানাটানির সংসার
ডানলপে ভাড়া বাড়িতে থাকেন রিনা মণ্ডল। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, তবে মেয়ে এখনও মায়ের সঙ্গেই থাকেন। মা-মেয়ে দু’জনেই গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। রিনা ছ’টি বাড়িতে কাজ করেন, তাঁর মেয়ে চারটিতে। কোনও বাড়িতে মাসে ৭০০ টাকা, কোথাও ৮০০। এই সামান্য আয়েই সংসার চলে। রিনার কথায়, 'আমরা শ্রমিকের মর্যাদা চাই। নিরাপদ জীবন চাই।'
কসবার মালতী বসাক প্রায় ২৫ বছর ধরে এই পেশায়। তাঁর প্রশ্ন, 'আমাদের জীবন তো এভাবেই কেটে গেল। আমাদের ছেলেমেয়েরাও কি একই কাজ করবে? ওদের জন্য কি অন্য কোনও পথ নেই?'
সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যূনতম মজুরির দাবি
গৃহপরিচারিকাদের দাবি, অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য যে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প রয়েছে, তার পূর্ণ সুবিধা তাঁরা পেতে চান। প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো সুরক্ষাও তাঁদের প্রাপ্য বলে মনে করেন তাঁরা।
ভোটের মুখে সারা বাংলা পরিচারিকা সমিতির রাজ্য সম্পাদিকা পার্বতী পাল সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, 'ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা বাড়ানো হচ্ছে, বেকার যুবকদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জন্য কোনও স্থায়ী সমাধান নেই। শ্রমিকের অধিকার কেন দেওয়া হচ্ছে না?'
বহু বছর আগে রাজ্য সরকার গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম পারিশ্রমিক নির্ধারণের অঙ্গীকার করেছিল। বলা হয়েছিল, তাঁদেরও ন্যূনতম মজুরি আইন (১৯৪৮)-এর আওতায় আনা হবে। দিল্লি, কেরল, তামিলনাড়ু-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ।
সংগঠনগুলির দাবি, ঘণ্টায় অন্তত ৭৫ টাকা ন্যূনতম মজুরি এবং মাসে চার দিন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে গৃহশ্রম সম্ভবত নারীদের বৃহত্তম কর্মক্ষেত্র। বহু মহিলা একাই সন্তান প্রতিপালন করছেন এই আয়ে। তাই তাঁদের দাবি, ভাতা নয়, প্রয়োজন আইনি স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা। ভোটের আবহে সেই দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।