
ইরান-ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চরমে। USA-র অভিযোগ, তেহরান গোপনে পরমাণু বোমা তৈরির পথে হাঁটছে। এই ইস্যুতেই আপত্তি তুলেছে আমেরিকা ও ইজরায়েল। প্রশ্ন উঠছে; কোনও দেশ কি চাইলেই পরমাণু বোমা বানাতে পারে? আন্তর্জাতিক আইন বা নীতি এ বিষয়ে কী বলছে? বিশ্ব রাজনীতিতে পারমাণবিক অস্ত্র শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক নয়, কূটনৈতিক প্রভাবেরও হাতিয়ার। কিন্তু সেই অস্ত্র তৈরি বা অধিকার করার ক্ষেত্রে রয়েছে কড়া আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ।
NPT-ই মূল ভিত্তি
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি হল Treaty on the Non-Proliferation of Nuclear Weapons (NPT)। ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল লক্ষ্য; পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সুনিশ্চিত করা।
এই চুক্তি অনুযায়ী পাঁচটি দেশকে 'পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তারা হল, United States, Russia, United Kingdom, France এবং China। এরা ১ জানুয়ারি ১৯৬৭-র আগে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
অন্য দেশগুলি NPT-তে সই করলে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। বিনিময়ে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়। অর্থাৎ গবেষণা বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধা নেই। কিন্তু অস্ত্র বানানো যাবে না।
ইরানের অবস্থান কী?
Iran NPT-তে স্বাক্ষরকারী দেশ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী তারা পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারে না। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর অধিকার তাদের রয়েছে। এখানেই বিতর্ক; ইউরেনিয়াম সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী? বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, নাকি অস্ত্র তৈরি?
বারবার এই প্রশ্নেরই মুখোমুখি হয়েছে ইরান ও আন্তর্জাতিক মহল।
সব দেশ কি NPT মানে?
না। কিছু দেশ NPT-তে সই করেনি। যেমন India, Pakistan এবং Israel। এদের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত। আবার North Korea NPT-তে সই করেও পরে সরে দাঁড়ায় এবং পরমাণু পরীক্ষা চালায়।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন থাকলেও তার প্রয়োগ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক নীতির সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, NPT পারমাণবিক বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা নিখুঁত নয়। কারণ, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম কোনও দেশ চাইলে গোপনে অস্ত্র কর্মসূচি চালাতে পারে। তবে ধরা পড়লে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং কূটনৈতিক চাপে পড়তে হয়।
ইরান ইস্যুতে সেই আশঙ্কাই প্রকাশ্যে এসেছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের দাবি, তেহরানের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ নয়। অন্যদিকে ইরানের দাবি, জ্বালানি নিরাপত্তাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সুতরাং, কোনও দেশ ইচ্ছে করলেই পরমাণু বোমা বানাতে পারে না। অন্তত আন্তর্জাতিক নীতি তাই বলছে। NPT-র মতো চুক্তি সেই পথই অবরুদ্ধ করেছে। তবে ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সমীকরণই শেষ কথা বলে। ইরানকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে প্রশ্ন তুলছে, তা একেবারে অগ্রাহ্য করার মতোও নয়। তবে প্রমাণ ছাড়াই কি যুদ্ধের আগ্রাসন শুরু করা যায়? সেই প্রশ্নই এখন ভাবাচ্ছে কূটনৈতিক মহলকে।