
পেট্রোল, ডিজেল, এলপিজি। শুধু একটা ফোন কল বা পেট্রোল পাম্পে যাওয়ার অপেক্ষা। কত সহজলভ্য, কত সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু এই সাধারণ জিনিসটির পিছনেই যে সারা বিশ্বের কত দেশের মানুষের পরিশ্রম জড়িয়ে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এই তিনটিরই 'যাত্রা' শুরু হয় পৃথিবীর গভীর ভাণ্ডার থেকে। সেখান থেকে পাইপলাইন, বিশাল তেল ট্যাঙ্কার এবং সমুদ্রপথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তা সাধারণ মানুষের ঘর, রান্নাঘর ও গাড়ির ট্যাঙ্কে পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ার ফলে এই পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাই সমস্যার মুখে পড়েছে। বিশেষত Iran-কে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
মাটির গভীর থেকে যাত্রা শুরু
পেট্রোল বা ডিজেলের মূল উৎস হল অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল। লক্ষ লক্ষ বছর আগে সমুদ্রের জীব ও উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ মাটির নীচে চাপা পড়ে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে হাইড্রোকার্বনে রূপান্তরিত হয়েছে। এই হাইড্রোকার্বন থেকেই তৈরি হয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। ইরানের মতো দেশে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার রয়েছে।
তেল উত্তোলনের জন্য ব্যবহার করা হয় স্থলভাগের অয়েল ওয়েল এবং সমুদ্রের অফশোর প্ল্যাটফর্ম। অনেক সময় সমুদ্রের মাঝখানে থাকা প্ল্যাটফর্ম থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল তীরে আনা হয়, আবার কখনও তা ভাসমান স্টোরেজ জাহাজে জমা রাখা হয়।
রিফাইনারিতে বদলে যায় তেলের রূপ
মাটির নিচ থেকে ওঠা কাঁচা তেল সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। সেটিকে পাঠানো হয় রিফাইনারিতে। সেখানে বিভিন্ন তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে আলাদা করা হয় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন’।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রুড অয়েল থেকে তৈরি হয় পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, এলপিজি, ন্যাফথা, বিটুমেন এবং নানা ধরনের লুব্রিকেন্ট। এই জ্বালানিগুলিই পরে শিল্প, যানবাহন এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয়।
এলপিজি ও এলএনজি তৈরি হয় কীভাবে?
বাড়ির রান্নাঘরে ব্যবহৃত রান্নার গ্যাস এলপিজি মূলত প্রোপেন ও বিউটেন গ্যাসের মিশ্রণ। এটি দুটি উপায়ে তৈরি হয়; প্রাকৃতিক গ্যাস পরিশোধনের সময় এবং ক্রুড অয়েল রিফাইনিংয়ের সময়। উচ্চচাপে এই গ্যাসকে তরলে পরিণত করে সিলিন্ডার বা ট্যাঙ্কারে ভরা হয়, যাতে সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহণ করা যায়।
অন্য দিকে এলএনজি বা লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস হল প্রাকৃতিক গ্যাসের তরল রূপ। যখন দীর্ঘ সমুদ্রপথে গ্যাস পাঠাতে হয়, তখন সেটিকে প্রায় –১৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা করে তরল করা হয়। এতে গ্যাসের আয়তন প্রায় ৬০০ গুণ কমে যায় এবং বিশেষ ক্রায়োজেনিক জাহাজে সহজে পরিবহণ করা সম্ভব হয়।
কোথায় মজুত থাকে?
জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয় বিশাল স্টোরেজ ব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক, বন্দর এলাকায় ট্যাঙ্ক ফার্ম, সমুদ্রে ভাসমান স্টোরেজ জাহাজ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ।
ইরানের খার্গ দ্বীপের মতো রপ্তানি টার্মিনালগুলিতে শত শত বিশাল তেলের ট্যাঙ্ক রয়েছে, যেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল পাঠানো হয়।
পাইপলাইন থেকে সুপারট্যাঙ্কার
তেল ও গ্যাস পরিবহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম পাইপলাইন। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে রিফাইনারি পর্যন্ত তেল বা গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হয় এই পাইপলাইনের মাধ্যমেই। রিফাইনারি থেকে শহরাঞ্চলে পেট্রোল ও ডিজেল পৌঁছায় রেল ট্যাঙ্কার বা ট্রাকের মাধ্যমে।
সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল পরিবহণ হয় সমুদ্রপথে। বিশাল সুপারট্যাঙ্কার একবারে কয়েক লক্ষ টন তেল বহন করতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ
পশ্চিম এশিয়ার তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর প্রধান সমুদ্রপথ হল Strait of Hormuz। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথের উপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
ভারতের মতো দেশ, যাদের বড় অংশের তেল আমদানি করতে হয়, তাদের জন্য এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি পেট্রোল-ডিজেলের দাম, শিল্প উৎপাদন এবং রান্নার গ্যাসের সরবরাহের উপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির এই দীর্ঘ যাত্রাপথ; মাটির গভীর থেকে রিফাইনারি, সেখান থেকে পাইপলাইন, ট্যাঙ্কার এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বাড়ি; আসলে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু তেল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রতিটি দেশের দৈনন্দিন জীবনে।