
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জের। হরমুজ প্রণালীতে(Strait of Hormuz) জাহাজ চলাচল নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগের পরিস্থিতি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহণের বড় অংশই এই সরু প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এখানে সামান্যতম অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও সম্প্রতি খবর মিলেছে, বিপুল পরিমাণ এলপিজি বোঝাই দুটি ভারতীয় জাহাজ নিরাপদে ভারতের দিকে এগোচ্ছে। ফলে আপাতত আতঙ্কের কোনও কারণ নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন; এত গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক সমুদ্রপথ দিয়ে কীভাবে জাহাজ পণ্য নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছয়? সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন মার্চেন্ট নেভির এক আধিকারিক।
একটি জাহাজের সঙ্গেই একাধিক দেশের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে
মার্চেন্ট নেভিতে দীর্ঘদিন কাজ করা এক সেকেন্ড অফিসারের কথায়, সাধারণ মানুষের ধারণা অনেক সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। অনেকেই মনে করেন, একটি জাহাজ যে দেশের, সেই দেশই সবকিছু পরিচালনা করে। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি অনেক বেশি জটিল।
একটি কার্গো জাহাজে যে নাবিকরা কাজ করেন, তাঁরা এক দেশের নাগরিক হতে পারেন। আবার জাহাজ পরিচালনা করে যে ম্যানিং কোম্পানি, সেটি থাকতে পারে অন্য দেশে। জাহাজের মালিকানা থাকতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের কোনও সংস্থার হাতে।
এখানেই শেষ নয়। যে পণ্য জাহাজে বহন করা হচ্ছে, তার মালিক হতে পারে আরেকটি দেশের কোম্পানি। পাশাপাশি জাহাজ যে বন্দর থেকে পণ্য তুলছে এবং যে বন্দরে তা নামাবে, সেই দেশও আলাদা হতে পারে। ফলে সমুদ্রের মাঝখানে কোনও সমস্যা তৈরি হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
মাঝসমুদ্রে জরুরি পরিস্থিতি
এই ধরনের জটিলতার একটি বাস্তব উদাহরণও তুলে ধরেছেন ওই নাবিক। তাঁর কথায়, একবার তাঁদের জাহাজ Atlantic Ocean-এর মাঝামাঝি এলাকায় ছিল। সেই সময় হঠাৎ এক নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
কিন্তু তখন এমন অবস্থান ছিল যে, পিছিয়ে Brazil-এ ফিরতে প্রায় দশ দিন সময় লাগত। আবার সামনে এগিয়ে South Africa পৌঁছতেও প্রায় একই সময় লাগত। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না।
অবশেষে জাহাজের মালিক সংস্থা, পণ্য মালিক কোম্পানি এবং গন্তব্য বন্দরের কর্তৃপক্ষ— সকলকে জানিয়ে আলোচনা করে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা প্রায় নেই বললেই চলে
সমুদ্রপথে বিপুল মূল্যের পণ্য পরিবহণ হলেও অধিকাংশ কার্গো জাহাজে বিশেষ কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। মার্চেন্ট নেভির কর্মীদের হাতে সাধারণত কোনও অস্ত্রও থাকে না। ফলে জলদস্যু বা অন্য কোনও বিপদের মুখে পড়লে তাঁরা সরাসরি প্রতিরোধ করতে পারেন না।
এই পরিস্থিতিতে জাহাজের গতি বা রুট বদল করে বিপদ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজনে নিকটবর্তী দেশের নৌবাহিনীর সাহায্য চাওয়া হয়। বিশেষ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে, যেমন Somalia সংলগ্ন এলাকায়, কখনও কখনও অস্থায়ী নিরাপত্তা রক্ষী ভাড়া করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত নৌসেনা আধিকারিক Girish Kumar-এর মতে, বাস্তবে অধিকাংশ কার্গো জাহাজের নিরাপত্তা খুবই সীমিত। জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক সময় নৌবাহিনীকেই এগিয়ে এসে উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।
মার্চেন্ট নেভির খুঁটিনাটি
মার্চেন্ট নেভিতে কর্মরত অধিকাংশ নাবিক চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। সাধারণত অফিসারদের চুক্তির মেয়াদ প্রায় ছয় মাসের হয়। অন্য দিকে ক্রু সদস্যরা প্রায় নয় মাস পর্যন্ত জাহাজে কাজ করেন। এই সময়ের মধ্যেই তাঁদের বেতন প্রদান করা হয়।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে খাদ্য, পানীয় জল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস আগেই মজুত করে রাখা হয়। জাহাজে আলাদা কোল্ড স্টোরেজে মাছ, মাংস, সবজি এবং শুকনো খাবার রাখা থাকে, যাতে কয়েক মাস সহজেই চলতে পারে।
পানীয় জলের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সমুদ্রের জল পরিশোধন করে তা ব্যবহারযোগ্য করা হয়। তবে কোনও কারণে জাহাজ দীর্ঘ সময় আটকে গেলে এবং বাইরে থেকে সরবরাহ না পেলে তখন রেশনিং করেও চলতে হয়।