
আফগানিস্তানে ওষুধের বাজারে একটি বড় পরিবর্তনের ছবি ধরা পড়েছে। এক আফগান ব্লগার ফাজল আফগান নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। যা এখন সে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারে ভারতীয় ওষুধের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে এনেছে।
ফাজল জানান, তিনি মাথাব্যথার জন্য পরিচিত তুর্কি ও পাকিস্তানি ব্র্যান্ড প্যারল কিনতে গিয়েছিলেন। দোকানদার তাকে জানান, একই উপাদানের একটি ভারতীয় ওষুধ পাওয়া যায়, যা তুর্কি ওষুধের তুলনায় দামে চার গুণ কম। ওষুধটির নাম, প্যারাসিটামল।
তুরস্কে তৈরি প্যারলের ১০টি ট্যাবলেটের দাম ছিল ৪০ আফগানি, সেখানে ভারতীয় ওষুধের দাম মাত্র ১০ আফগানি। শুরুতে গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কম দামের কারণে তিনি ভারতীয় ওষুধটি কিনে নেন। পরে তিনি লেখেন, এই ওষুধ দ্রুত তার মাথাব্যথা সারিয়ে দেয় এবং দোকানদারও দাবি করেন, ওষুধ নাকি আরও ভাল ফল দেয়।
ফাজলের মন্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, 'আফগানিস্তানে ধীরে ধীরে পাকিস্তানি ওষুধের জায়গা দখল করছে ভারতীয় ওষুধ।'
কেন আফগানিস্তানে ধীরে ধীরে পাকিস্তানি ওষুধের জায়গা দখল করছে ভারত?
ভৌগোলিকভাবে স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় এবং নিজস্ব ওষুধ শিল্প দুর্বল হওয়ায় আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে ব্যবহৃত প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ পাকিস্তান থেকে আসত। ২০২৪ সালে পাকিআফগানিস্তানে প্রায় ১৮৬.৬৯ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রফতানি করেছিল।
কিন্তু সীমান্ত সংঘর্ষ, বিশেষ করে টোরখাম ও চামান সীমান্ত বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে নতুন করে সংঘর্ষের পর আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদার পাকিস্তানি ওষুধের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। অভিযোগ ছিল, ওষুধের মান খারাপ এবং সরবরাহ অনিশ্চিত।
এর ফলে দেশজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন ও হৃদরোগের ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বা নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগও ওঠে।
কীভাবে এগিয়ে এল ভারত?
এই সংকটের মধ্যেই ভারত আফগানিস্তানের পাশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঘোষণা করেন, ৭৩ টন জীবনদায়ী ওষুধ জরুরি ভিত্তিতে কাবুলে পাঠানো হয়েছে। এর আগেও ভারত একাধিকবার সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালে ৪.৮ টন টিকা (রেবিস, হেপাটাইটিস-বি), ৬টি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুল্যান্স, ১২৮ স্লাইস সিটি স্ক্যানার, ২০২২ সালের ভূমিকম্পের পর ১৩ টন চিকিৎসা সামগ্রী ও কোভিড টিকা পাঠিয়েছে ভারত।
গত ৪ বছরে ভারত মোট ৩২৭ টনের বেশি চিকিৎসা সামগ্রী আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি কাবুলে ৩০ শয্যার হাসপাতাল, ক্যান্সার ও ট্রমা সেন্টার এবং থ্যালাসেমিয়া সেন্টার তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
ভারতীয় ওষুধ কীভাবে পাকিস্তানকে রিপ্লেস করছে?
বর্তমানে আফগানিস্তানের ওষুধের বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব প্রায় ১২-১৫ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, পাকিস্তানের আগের বাজার ছিল ৩৫-৪০ শতাংশ। যা এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় সংস্থা জাইডাস লাইফসায়েন্সেস আফগানিস্তানের রফিস ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সঙ্গে ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানেই উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে আমদানির উপর নির্ভরতা কমে।
সব মিলিয়ে, ফাজল আফগানের মতো সাধারণ একজন ক্রেতার অভিজ্ঞতা আসলে বড় এক পরিবর্তনের প্রতিফলন। কম দাম, সহজলভ্যতা এবং কার্যকারিতার কারণে ভারতীয় ওষুধ ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের বাজারে পাকিস্তানি ওষুধের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। টি শুধু একটি ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতারই ইঙ্গিত।