
ইরানে নতুন বছরের সূচনাতেই ফের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি, ভয়াবহ মুদ্রাসঙ্কট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র বিক্ষোভ। প্রথমে তেহরান ও বড় শহরগুলিতে শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেই আন্দোলনের আঁচ পৌঁছে গিয়েছে গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকাতেও। একাধিক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর সংঘর্ষে প্রাণহানির খবর মিলেছে।
অর্থনৈতিক চাপেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ
ইরানের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি। ডিসেম্বর মাসে দেশে মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে প্রায় ৪২.৫ শতাংশে। তার উপর ২০২৫ সালে ডলারের তুলনায় ইরানি রিয়ালের মূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা, পরমাণু পরিকাঠামো ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ইজরায়েল-আমেরিকার হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শহর ছেড়ে গ্রামেও ছড়াল আন্দোলন
তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে লোরদেগান, কুহদশ্ত, ইসফাহান-সহ একাধিক শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বহু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে, কোথাও কোথাও গুলির আওয়াজও শোনা গিয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের।
‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, রাজপথে রাজনৈতিক স্লোগান
তেহরানে ছাত্রসমাজ ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়েছে। একই সঙ্গে শোনা গিয়েছে প্রাক্তন শাহ পরিবারের সদস্য রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান। নির্বাসনে থাকা রেজা পাহলভিও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান শাসনব্যবস্থা বহাল থাকলে ইরানের অর্থনীতি আরও ধ্বংসের মুখে পড়বে।
সংঘর্ষে মৃত্যু, বাড়ছে উত্তেজনা
লোরদেগানে সংঘর্ষ চলাকালীন দু’জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর খবর মিলেছে। কুহদশ্তে বশিজ আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্যের মৃত্যু ও একাধিক আহত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। যদিও কিছু মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, নিহত ওই বশিজ সদস্য বিক্ষোভেই অংশ নিয়েছিলেন—এই তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই হয়নি।
সরকারি কড়াকড়ি ও গ্রেফতার
বিক্ষোভ দমনে কেরমানশাহ, খুজেস্তান, হামেদান-সহ একাধিক প্রদেশে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। বহু জায়গায় বাজার বন্ধ থাকার খবরও মিলেছে। সরকার শীতের অজুহাতে সাধারণ ছুটি ও আংশিক লকডাউন ঘোষণা করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল উদ্দেশ্য বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা।
আলোচনার আশ্বাস, তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী ও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হবে। তবুও বাস্তব চিত্র বলছে, মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ ধীরে ধীরে ইরানে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের রূপ নিচ্ছে।