
Iranian women protest: আগুন। রক্ত। স্লোগান। বিদ্রোহের ছাই সরিয়ে জন্ম নিচ্ছে একের পর এক ফিনিক্স। গত দু’সপ্তাহ ধরে গণ-অভ্যু্ত্থানে অশান্ত ইরান। তার মাটিতে দাঁড়িয়েই আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের জ্বলন্ত ছবির আগুনে সিগারেট ধরাচ্ছেন মহিলারা। সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছে এই ছবি। কথায় বলে, একটি ছবি হাজার কথা বলে। এ যেন ঠিক তাই। শুধু কথা, বা প্রতিবাদ নয়। কার্যত চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে। চ্যালেঞ্জ নারীর উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। চ্যালেঞ্জ ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে। শুধু ইরান নয়। যেন সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় বিদ্রোহের ভাষা হয়ে উঠেছে এই ছবিগুলি।
প্রথমে অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর বেকারত্বের প্রতিবাদেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে দ্রুতই তা বৃহত্তর, সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। শুধু সংস্কারের দাবিতে আর আটকে নেই আন্দোলনকারীরা। প্রতিবাদীরা সরাসরি ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করছেন। সেই বিদ্রোহের আগুনেই পুড়ছে শাসকের ছবি।
২৮ ডিসেম্বর থেকে তেহরান-সহ দেশের নানা শহরের রাস্তায় নেমেছেন তরুণ থেকে বৃদ্ধ, সকলেই। 'ডেথ টু খামেনেই' স্লোগানে কেঁপেছে ইরানের রাজপথ। প্রতিবাদীদের একাংশের দাবি, ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলাভিকেই ফিরিয়ে আনা হোক। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে রেজা পাহলাভির বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
স্লোগানের ভিড়ে নজর কেড়েছে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। ইরানি মহিলাদের ঠোঁটে সিগারেট। খামেনেইয়ের জলন্ত ছবি থেকে তাতে আগুন ধরাচ্ছেন। ওঁরা নির্ভীক। অবাধ্য। বীতশ্রদ্ধ।
এই ধরনের প্রতিবাদ অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয়েছিল ২২ বছরের মাহসা আমিনির। তাপর যে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, তখনও এমন প্রতীকী বিদ্রোহ দেখা গিয়েছিল। 'নীতি পুলিশে'র হাতে 'অনুপযুক্ত পোশাক' পরার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন মাহসা। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠে ইরান। সেই আন্দোলনে প্রাণ হারান ৫০০ রও বেশি মানুষ।
আইন অনুযায়ী, ইরানে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানো গুরুতর অপরাধ। সেদেশে প্রকাশ্যে নারীদের ধূমপানও নিষিদ্ধ। তবুও সমস্ত বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করেই এই প্রতিবাদ। গত বছর ওমিদ সারলাক নামে এক ব্যক্তি খামেনেইয়ের ছবি পোড়ানোর ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি গাড়ির ভিতর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। তেহরানের প্রধান কৌঁসুলি জানিয়েছেন, সরকারি ভবন পোড়ানো বা এই ধরনের প্রতিবাদে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবু শনিবার পর্যন্ত আন্দোলন থামেনি। এক চিকিৎসকের দাবি, মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২০০ তে।
এর মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও কিছু ভিডিও ঘুরছে। কোথাও মহিলারা হিজাব পোড়াচ্ছেন। কোথাও হিজাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রকাশ্য প্রতিবাদ। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ডঃ. মালুফ লিখেছেন, 'অল্পবয়সী ইরানি মহিলারাই ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।' লেখক ও আইনজীবী ক্লে ট্রাভিসের মতে, 'এঁরা একবিংশ শতকে আমেরিকার কোনও তথাকথিত নারীবাদীর থেকেও ঢের বেশি সাহসী।'
প্রতিবাদ শুধু তরুণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, রক্তমাখা মুখে এক বৃদ্ধা মহিলা চিৎকার করছেন। বলছেন, 'আমি ভয় পাই না। আমি তো গত ৪৭ বছর ধরেই মৃতের মতো বেঁচে আছি!' এই একটি বাক্যেই যেন ইরানের দীর্ঘ, দমবন্ধ করা ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।
মাহসা আমিনির ঘটনার পর থেকেই সেদেশে হিজাব আইন অমান্য করার প্রবণতা বেড়েছে। গত তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়, খেলাধুলার মাঠে মাথা খোলা অবস্থায় মহিলাদের উপস্থিতি বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে নগ্ন অবস্থায় এক মহিলা পুলিশের গাড়ির উপর লাফিয়ে ওঠেন। সেই ভিডিওও ভাইরাল হয়। তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক তরুণী ছাত্রীকে হিজাব না পরায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। প্রতিবাদে তরুণী সেখানেই পরনের পোশাক খুলে ফেলেন। অন্তর্বাসে হেঁটে প্রতীকী প্রতিবাদের সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়েছিল। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। মানসিক রোগীদের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। পড়ুন সেই খবর: অন্তর্বাস পরে ইরানের রাস্তায় যুবতী VIRAL, মারাত্মক শাস্তি দেখে গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত
খামেনেইয়ের সংকট ত্রমেই বাড়ছে। আগুন, সিগারেট... এগুলি খালি ভাইরাল ছবি নয়। এগুলি এক-একটি নিঃশব্দ ঘোষণাপত্র। এ যেন ভয়কে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলার ইঙ্গিত। সেই আগুনের ধোঁয়াতেও যেন মিশে স্বাধীনতার গন্ধ।