
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিশ্বের গোপন বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম বিষয়। একাধিক বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলার পরেও ইরান লুকিয়ে নিজেদের এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। দাবি করা হয় পাহাড়ের ভিতর, গভীর সুড়ঙ্গে অথবা সামরিক এলাকায় গোপন করে রাখা হয়েছে এই পরমাণু কেন্দ্রগুলি। তবে যদি কখনও এই পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষাগারগুলি ধ্বংস করতে হয়, তাহলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের স্পেশাল ফোর্স সরাসরি এই জায়গাগুলিতে হামলা চালাতে পারে। এমনকি স্থল অভিযানও করতে পারে দুই দেশের যৌথ সেনা।
নাতানজ পরমাণু কমপ্লেক্স - ইরানের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম কেন্দ্র
এই এলাকাটি ইরানের ইসফাহান প্রদেশের নাতানজ শহরের কাছে অবস্থিত। এটি ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন, মাটির উপরে এবং মাটির নীচে উভয় স্তরেই এখানে কাজ চলে। ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন-ইজরায়েলি আক্রমণে মাটির উপরে অবস্থিত কেন্দ্রটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ অংশটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু নাতানজ থেকে মাত্র ১.৬ কিলোমিটার দক্ষিণে পিকাক্স মাউন্টেন নামে একটি নতুন গোপন স্থান তৈরি করা হচ্ছে। এটি ১০০ মিটার গভীর সুড়ঙ্গের একটি স্থান যেখানে নতুন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কাজ চলছে। স্পেশাল ফোর্সের প্রয়োজন হলে, মার্কিন ডেল্টা ফোর্স অথবা ইসরায়েলের বাহিনী এই সুড়ঙ্গে অপারেশন চালাতে পারে।
ফোর্ডে ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট - পাহাড়ের ভেতরে লুকানো সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা
তেহরানের প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কোম শহরের কাছে একটি পাহাড়ের ভেতরে তৈরি করা হয়ছে ফোর্ডে। এই কেন্দ্রটি ৮০ মিটার গভীর এবং খুব শক্তিশালী কংক্রিট দিয়ে ঢাকা। এখানেও ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টের কাজ করা হয়। ২০২৫ সালের হামলায় এই প্ল্যান্টে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়নি।
এই পরমাণু ঘাঁটি এতটাই গভীরে যে এমন এলাকায় বিমান হামলা করা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, মার্কিন-ইজরায়েলি স্পেশাল ফোর্স স্থল অভিযান করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে বিশেষ বাহিনী গোপনে প্রবেশ করে সেন্ট্রিফিউজ বা অন্যান্য সরঞ্জাম ধ্বংস করতে পারে।
ইসফাহান পরমাণু প্রযুক্তি কেন্দ্র
ইসফাহান শহরের এই বিশাল কমপ্লেক্সটি ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তরিত করে ধাতুতে রূপান্তরিত করা হয়। ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম একটি ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্সে সংরক্ষণ করা হয়। ২০২৫ সালের হামলায় ১১টি ভবন এবং টানেলের মুখ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিছু অংশ এখনও রয়ে গেছে।
IAEA রিপোর্টে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ অংশই নিরাপদে রয়েছে। এই জায়গাটি তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে। যদি আমেরিকা ও ইজরায়েল সেখানে একটি বিশেষ অভিযান চালায়, তাহলে ইজরায়েলের বিশেষ নৌ বাহিনী বা মার্কিন ডেল্টা ফোর্স হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশপথে নামানো যেতে পারে।
পারচিন মিলিটারি কমপ্লেক্স - সন্দেহভাজন পরমাণু অস্ত্রের জায়গা
পারচিন তেহরানের ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক মহলের সন্দেহ পরমাণু বোমা সংক্রান্ত পরীক্ষা চালানোর মতো কার্যকলাপ এই জায়গা থেকেই চালানো হয়েছিল। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দুবার এই জায়গায় আক্রমণ করা হয়েছিল। স্থানীয় সূত্রে দাবি সম্প্রতি, এই এলাকায় কংক্রিটের ঢাল এবং নতুন টানেল তৈরি করা হচ্ছে।
কখনও স্থল অভিযানের প্রয়োজন হয়ে পড়লে ইজরায়েলের সায়েরেত মাতকাল অথবা মার্কিন ডেল্টা ফোর্স এই সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশ করে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে অথবা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ধ্বংস করতে পারে।
মিনজাদেহেই এবং লাভিশান-শিয়েন - সবচেয়ে গোপন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির স্থান
তেহরানের আশেপাশে অবস্থিত মিনজাদেহেই, লাভিশান-শিয়ান এবং লাভিশান-২ এলাকাগুলি ইরানের সবচেয়ে গোপন পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র বলে মনে করা হয়।
এই স্থানগুলিতে ইরানের এসপিএনডি সংস্থা কাজ করত, যারা আদতে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে কখনও এই কেন্দ্রগুলি পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কেন মার্কিন-ইজরায়েলি বিশেষ বাহিনী এই জায়গায় নেমে অবতরণ করতে পারে
আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স এবং ইসরায়েলের সায়েরেত মাতকাল বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ইউনিটগুলির মধ্যে একটি। তারা গভীর সুড়ঙ্গ, পাহাড় এবং শহরে কাজ করে। সমুদ্রে অবতরণ বা চলন্ত হেলিকপ্টার থেকে নামার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। যুদ্ধে বিমান হামলায় অনেক স্থান ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তবে সেগুলি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে বা প্রমাণ সংগ্রহ করতে বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে ইরান বা ইজরায়েল এই জায়গাগুলিতে স্থল অভিযান চালাতে পারে।