
হরমুজ প্রণালী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। আর সেই জলপথই বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে। আর সেই সুযোগেই নতুন কৌশল। নিরাপদে পারাপারের জন্য মোটা অঙ্কের 'টোল' আদায়ের অভিযোগ উঠছে তেহরানের বিরুদ্ধে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই হরমুজ প্রণালীকে কার্যত কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান; এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিশ্ববাজারে তার বড় প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ নয়, আবার স্বাভাবিকও নয়। মার্চ মাসে এই পথ দিয়ে মাত্র ১৩৮টি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতিদিনই গড়ে ১৩৮-১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে মাত্র ৫-৬টি জাহাজ পারাপার করছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২,০০০ জাহাজ এখনও এই অঞ্চলের আশেপাশে আটকে রয়েছে।
অভিযোগ, ইরান এখন বেছে বেছে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। যেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো, তাদের জাহাজকেই ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার চেষ্টা করলে হামলার মুখেও পড়তে হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ২০টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে চীন বড় সুবিধাভোগী। মার্চ মাসে ১.২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল চিন পৌঁছেছে। অনেক জাহাজ নিজেদের চিনর সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করছে নিরাপদ পথ পাওয়ার জন্য। ভারতগামী ছ’টি ট্যাঙ্কার ইতিমধ্যেই হরমুজ পেরিয়েছে, তবে এখনও প্রায় ২০টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ আটকে রয়েছে, যেখানে ৫৪০ জন ভারতীয় নাবিক রয়েছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, নিরাপদে পারাপারের জন্য প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। তবুও আন্তর্জাতিক মহলে ‘Tehran Toll Booth’ তত্ত্ব নিয়েই জোর চর্চা চলছে।
জাহাজ পারাপারের পুরো প্রক্রিয়াটিও এখন অত্যন্ত জটিল। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এই রুট। জাহাজের মালিকানা, পণ্য, ক্রু; সব তথ্য জমা দিতে হয়। অনুমতি মিললে নির্দিষ্ট কোড ও রুট দেওয়া হয়। তারপর টহল নৌকা দিয়ে জাহাজকে নিরাপদে পার করানো হয়।
এদিকে, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমা খরচও আকাশছোঁয়া। আগে যেখানে প্রিমিয়াম ছিল ০.২৫ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ৩ থেকে ৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে একটি বড় ট্যাঙ্কারের ক্ষেত্রে বিমা খরচ কয়েক লাখ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭০-৯০ লাখ ডলার পর্যন্ত।