
সাপের স্যুপ। শুনেই নাক সিঁটকোচ্ছেন তো। অথচ এই পদই শীতকালে রমরমিয়ে বিক্রি হয় চিনের হংকংয়ে। দামও নেহাত কম নয়। মাথাপিছু খরচ প্রায় ৭ থেকে ১১ ডলার। ভারতীয় মূল্যে ৬০০ থেকে হাজার টাকা। অনেকে ভাববেন, এই টাকায় কেজি খানেক খাসির মাংস কিনে বাড়িতে জমিয়ে রান্না করলেই তো হয়! সাপের মাংস খাওয়ার জন্য এত খরচ কেন বাপু? উত্তর হল, যেখানকার সংস্কৃতি। খাদ্যাভাস।
চিনে এই সাপের মাংস খাওয়ার চল আজকের নয়। হাজার হাজার বছর আগের। যদিও সময় বদলেছে। ইয়ানটজে নদী দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নতুন নতুন খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পিৎজা, বার্গার এখন কমন ফুড হয়ে উঠেছে। অথচ কয়েকশো বছর আগেও সাপের মাংসের ব্যাপক চল ছিল চিনে। একে শাহি খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হত। শীতকালে বাড়ত চাহিদা। দোকানগুলোর বাইরে লম্বা লাইন পড়ত মানুষের। কিন্তু সেই দিন আর নেই। তাই সাপের স্যুপ বা মাংসের চাহিদা এখন কমেছে।
কিন্তু চাহিদা কমলেও চিন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি এই খাবার। এই শীতের সময় এখনও হংকংয়ের একাধিক রেস্তোরাঁয় সাপের স্যুপ বিক্রি হয়। কাস্টমার মূলত বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। শীতের পোশাক পরে তাঁরা সন্ধেবেলা ভিড় জমান দোকানে।
হংকং শহরের এমনই একটি রেস্তোরাঁ চালান চৌ কা-লিং। তাঁর বাবা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। রেস্তোরাঁওটি খুব আকর্ষণীয়। সাপের স্যুপ খাওয়া তো আর মুখের কথা নয়! অনেকে শুধুই চোখে দেখতে চান। সেই ইচ্ছেও পূরণ করেন চৌ। দোকানের দেওয়ালে থরে থরে সাজানো রয়েছে ড্রয়ার। তার ভিতরেই থাকে সাপ। কোনও কাস্টমার বললেই সেই ড্রয়ার খুলে দেন চৌ।
সাপ ধরা ও তা দিয়ে স্যুপ বানানোর কৌশল বাবার কাছেই শিখেছিলেন চৌ। সারাবছর তিনি দোকান চালান ঠিকই। তবে গ্রীষ্মকালে কাস্টমার কম থাকে। সেই সময় সাপ ধরার ডাকও পড়ে তাঁর। একাধিকবার সাপ ধরায় তাঁর নামডাকও বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। চিনের একাধিক গ্রামীণ সংবাদপত্রে সেই খবরও প্রকাশিত হয়। হংকংয়ের মানুষ চৌ-কে এখন 'সাপের রানি' বলে থাকেন।
আগেই বলেছি, খাদ্যাভাসের পরিবর্তনের কারণে চিনে সাপের মাংস খাওয়ার চল কমেছে। আরও একটি বড় কারণ ভাইরাসের আক্রমণ। চিন একাধিকবার ভাইরাসের কবলে পড়েছে। তারপর থেকে সাপ বা ওই জাতীয় সরিসৃপ খাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। ২০০৩ সালে SARS ভাইরাসের হানাও সাপের মাংসের প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারানোর অন্যতম কারণ। তবে সাপের স্যুপ যে টেস্টি খাবার, তা একবাক্যে স্বীকার করে নিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না যাঁরা খেয়েছেন তাঁরা।
কীভাবে বানোনো হয় সাপের স্যুপ? প্রথমেই বলে রাখা ভালো সাপের স্যুপ বানানো বেশ সময় সাপেক্ষ। সাপের মাংস প্রথমে ঘণ্টা দুয়েক সেদ্ধ করতে হয়। ঠান্ডা হলে চপস্টিক দিয়ে সেই মাংস দেহ থেকে আলাদা করা হয়। মাংস যত পাতলা হবে ততই ভালো। তারপর সাপের, মুরগির ও শুয়োরের হাড় কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা ফুটিয়ে স্যুপের বেস তৈরি করা হয়। তার মধ্যে এক এক করে দিতে হয় সাপ, শুয়োর, মুরগির মাংস, মাসরুম ও কমলা লেবুর খোসা। স্যুপ টেবিলে পরিবেশন করার সময় সঙ্গে দেওয়া হয় গোলমরিচের গুঁড়ো, পিঙ্ক সল্ট ও ধনেপাতা।
হংকং শহরে চালু রয়েছে এমন সাপের স্যুপের রেস্তোরাঁর সংখ্যা প্রায় ২০। শীতের সময় সেগুলোতে ভিড় হয়। নতুন নতুন রাঁধুনি দোকানে রাখেন মালিকরা। তবে গরমে স্যুপের দাম খুব কম। ১০০ টাকারও কমে বিক্রি হয়। তাই সব দোকান খোলা থাকে না।
চৌ জানাচ্ছেন, এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এই রেস্তোরাঁর দায়িত্ব নিতে চায় না। তারা ভাবতেই পারে না, এটা জীবিকা হতে পারে। কারণ, যে পরিশ্রম করতে হয় তার তুলনায় রোজগার কম। রয়েছে অনিশ্চয়তাও। তাই তিনিই অন্যদের পরামর্শ দেন, পার্ট টাইম কাজ হিসেবে এই পেশা বেছে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু, এর ভরসায় থাকলে সারাবছর পেটের ভাত জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সঙ্গে চৌ এও জানাচ্ছেন, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন এই ব্যবসা করবেন। সাপের মাংস রান্না করেই তাঁর নাম-ডাক। ছোটো থেকে এই কাজটিই করে আসছেন। তাঁর হাতের রান্নার তারিফও করেছেন অনেকে। রোজগার কম হোক, প্রশংসা যে জুটে যায় সেটাই বা কম কী!