
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় ঘটে যাওয়া এক নাটকীয় ঘটনায় গোটা বিশ্ব কার্যত স্তব্ধ। অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মধ্যরাতে বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিউইয়র্কে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত একাধিক মামলাও দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার চিন। মাদুরোকে গ্রেফতার করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বেজিং। চিনের মতে, এটি একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপ।
চিন বরাবরই ‘হস্তক্ষেপ না করার নীতি’র পক্ষে। তাদের বক্তব্য, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এই ধরনের সামরিক বা জোরপূর্বক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বিশেষ করে, যাকে চিন ‘চিরস্থায়ী কৌশলগত অংশীদার’ বলে মনে করে, সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে রাজধানী থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া বেজিংয়ের কাছে বড় ধাক্কা বলেই ধরা হচ্ছে।
‘আমেরিকা বিশ্বের বিচারক হতে পারে না’
রবিবার বেজিংয়ে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'কোনও দেশই বিশ্বের পুলিশ বা বিচারক হতে পারে না।' নাম না করেও তিনি ভেনেজুয়েলার ঘটনাকে ইঙ্গিত করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা অপরিহার্য।
গত শনিবার ৬৩ বছর বয়সি মাদুরোকে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরানো অবস্থায় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দিদশার সেই ছবি প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
আমেরিকার মুখোমুখি চিন-রাশিয়া
সোমবার নিউইয়র্কের একটি আদালতে মাদুরো মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। একই দিনে, কলম্বিয়ার অনুরোধে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই ঘটনা নিয়ে জরুরি বৈঠক বসে। সেখানে চিন ও রাশিয়া আমেরিকার পদক্ষেপের বিরোধিতা করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করতে পারে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘে চিনের স্থায়ী মিশনের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স সান লেই মার্কিন সিদ্ধান্তকে “হতবাক করার মতো” বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, 'ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। নির্বিচারে বলপ্রয়োগ আরও বড় সংকট ডেকে আনে।'
আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিবেশ গড়তে পারে চিন
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও বড় বাণিজ্যিক শক্তি হওয়ায় চিন আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে পারে। ‘চায়না-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্ট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এরিক ওল্যান্ডারের মতে, চিন সরাসরি ভেনেজুয়েলাকে বড় সামরিক সহায়তা দিতে না পারলেও, জাতিসংঘ ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে আমেরিকার বিরোধিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি লাতিন আমেরিকায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই অঞ্চল চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়।
সোমবার শি জিনপিং আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বশক্তিগুলির উচিত দায়িত্বশীল আচরণের উদাহরণ স্থাপন করা।
চিন-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের পটভূমি
১৯৭৪ সালে ভেনেজুয়েলা চিনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৮ সালে হুগো শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেও সেই ঘনিষ্ঠতা বজায় থাকে।
বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর আমেরিকা ও তার মিত্ররা নিষেধাজ্ঞা কড়া করলে, চিন ভেনেজুয়েলার তেল ও অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ করে। চিনা শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিন ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার প্রায় অর্ধেকই তেল।