
ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতারের পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যদি ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রশাসন আমেরিকার দাবি মেনে না নেয়, আরও একটি বড়সড় হামলা হবে। এই হামলাকে 'সেকেন্ড ওয়েভ' বা দ্বিতীয় ঢেউ বলছেন ট্রাম্প।
ওয়াশিংটন ডিসি-তে প্রেস কনফারেন্সে ট্রাম্পের হুমকি, 'ভেনেজুয়েলায় আরেকটি হামলার জন্য তৈরি আমেরিকা, আশা করি তার আগেই ওরা আমাদের সব দাবি মেনে নেবে। কে ভেনেজুয়েলার চার্জে আছে, আমাকে এই সব প্রশ্ন করবেন না। কারণ আমি যে উত্তরটা দেব,তা বিতর্কিত হবে। তবে ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ এখন আমাদের হাতেই। ভেনেজুয়েলা এখন একটি মৃত দেশ। আমাদের এখন দরকার তেল সংস্থাগুলি থেকে বড়সড় লগ্নি, যাতে দেশটির পরিকাঠামো উন্নত হয়। একাধিক তেল সংস্থা তৈরি আছে ভেনেজুয়েলার উন্নতির জন্য।'
হঠাত্ ট্রাম্প কেন ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করলেন? ভেনেজুয়েলা আমেরিকার দখলে এলে, কী লাভ হবে? ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যত্ কী? সব প্রশ্নের উত্তর রইল এই প্রতিবেদনে।
কেন ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কয়েক দশক ধরেই তিক্ত। শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, মূলত, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি, যেমন কিউবা, চিলি, কলম্বিয়ার সঙ্গে আমেকিরা বনিবনা হয় না। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আমেরিকার তিক্ত সম্পর্ক তিক্ততর হতে শুরু করে ১৯৯৯ সালে। তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ। নিজেকে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বলতেন। আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার সেনা ঢোকানোর তীব্র নিন্দা করেছিলেন শাভেজ। কিউবা ও ইরানের মতো দেশের সঙ্গে জোটও গড়েছিলেন। ২০০২ সালে ভেনেজুয়েলায় সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। ওই ঘটনায় সরাসরি আমেরিকার হাত রয়েছে, প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন শাভেজ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের কাছেই, বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির কড়া বা ‘হকিশ’ অংশের কাছে, ভেনেজুয়েলার সরকারের সমাজতান্ত্রিক আদর্শই তাকে আমেরিকার স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ঠিক যেমন কিউবা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার বন্ধু নয়। ভেনেজুয়েলাকেও তারা সেই একই দৃষ্টিতে দেখে। হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পরে রাজনৈতিক বিরোধীদের কড়া শাস্তি দেওয়া, দেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা সহ একাধিক অভিযোগ তোলে আমেরিকা। আমেরিকার দাবি ছিল, ভেনেজুয়েলায় মানবাধিকার বিপন্ন। এরপর ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পরে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক আরও খারাপ হতে শুরু করে।
২০১৯ সালে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরো সরকারকে অবৈধ আখ্যা দেয়। ভেনেজুয়েলার সংসদের স্পিকার হুয়ান গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে চায় আমেরিকা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা। মাদুরো বিপুল ভোটে হেরে যান। গোটা দেশে অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন তড়িঘড়ি বিরোধী নেতা এডমুন্ডো গঞ্জালেস ভিক্টর বা জয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। ভেনেজুয়েলার বিরোধী শিবির একটি ভোটিং ডেটা প্রকাশ করে, তাতে দেখানো হয়, জয়ী হয়েছেন গঞ্জালেস।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন একটি নীতিগত ঘোষণা প্রকাশ করে, যার নাম দেওয়া হয় 'ট্রাম্প করোলারি'। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধ (লাতিন আমেরিকা ও আশপাশের অঞ্চল) রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক, সব দিক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। এই নতুন ট্রাম্প নীতির অংশ হিসেবে আরও বলা হয়, প্রয়োজনে ওই অঞ্চলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে।
মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টা পরে প্রেস কনফারেন্সে ট্রাম্প উনিশ শতকের মনরো ডকট্রিনের (লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনার ক্ষমতা) প্রসঙ্গ টেনে নিজের নীতিকে ডন-রো ডকট্রিন আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে আর কোনও প্রশ্নই উঠবে না।'
ভেনেজুয়েলা দখল করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ?
বিপুল খনিজ তেলের ভাণ্ডার ভেনেজুয়েলা। সেই খনিজ তেলেই নজর ট্রাম্পের। কারণ, মাদুরোকে আটকের পরেই ট্রাম্প বললেন, 'আমদের বড় বড় তেল সংস্থা ভেনেজুয়েলায় হাজার হাজার মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। ভেনেজুয়েলার পরিকাঠামোর উন্নয়ন হবে দ্রুত।' ভেনেজুয়েলা এক সময় ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ। OPEC (অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ)–এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। OPEC এমন একটি জোট, যেখানে বিশ্বের বড় বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ রয়েছে, এবং যাদের সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। OPEC-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র অন্য। এক সময় যেখানে ভেনেজুয়েলা দিনে ৩০ লক্ষ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন করত, আজ সেখানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল দিনে, যা বিশ্ব তেল উৎপাদনের মোটামুটি ১ শতাংশ। তুলনায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিনে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। আগে ভেনেজুয়েলার অশোধিত তেলের বড় অংশই যেত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিফাইনারিগুলিতে। এখন সেই তেলের বড় অংশই চিনে রফতানি করা হয়। অতএব চিনের দিকে ভেনেজুয়েলার এই ঝুঁকে যাওয়া ভাল ভাবে নেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল খুব ভারী ও ঘন। এই তেলের শোধনের জন্য বিশেষ রিফাইনারির দরকার হয়। যে কোনও খনিজ তেল শোধনেই জলবায়ু পরিবর্তনের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল ভীষণ নোংরা ও ঘন। তাই শোধনের সময় দূষণ বেশি হয়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যত্ কী?
২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর থেকে। শাভেজের সময়ে মাদুরো ভেনেজুয়েলার বিদেশমন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, একনায়কতন্ত্রের। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০ হাজার ভেনেজুয়েলানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁর আমলে। দেশের আইনকে মানেননি তিনি। একনায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। আপাতত ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী সরকার চালাচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্য, 'আমরা ভেনেজুয়েলায় সেনার বুটের শব্দ নিয়ে চিন্তিত নই। আমাদের লক্ষ্য, ভেনেজুয়েলার পরিকাঠামোগত উন্নয়ন। দেশের জন্য অর্থ উত্পাদন। ভেনেজুয়েলার ব্যাপক খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চলেছি আমরা। ওই সম্পদ যাতে ভেনেজুয়েলার মানুষের আর্থিক উন্নতি ঘটায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা অন্যান্য দেশেও তেল বিক্রি করব।'