
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী আবারও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বুধবার এই প্রণালীতে তিনটি আলাদা হামলার ঘটনা ঘটেছে। পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল হামলা করা হয়েছে। এর ফলে একটি জাহাজে আগুন লেগেছে। এবং বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি পণ্যবাহী জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। জাহাজটির ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হলেও সমুদ্রে পণ্যবাহী অংশে আগুন জ্বলতে থাকে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। প্রণালীর প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার হলেও বড় জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যকর অংশ মাত্র প্রায় ১১ কিলোমিটার। ফলে এই সরু পথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তিনটি হামলার ঘটনা
প্রথম হামলা:
ওমানের উত্তরে হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এর ফলে জাহাজে আগুন ধরে যায়। ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি এমন সময় ঘটে যখন মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি মাইন-বিছানো জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছিল বলে জানা গেছে। যদিও ইরান এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
দ্বিতীয় হামলা:
ভারতীয় সময় সকাল ৭টা ২৮ মিনিটে হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি কন্টেইনার জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত করে। ঘটনাটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে ঘটে। জাহাজের কিছু ক্ষতি হলেও সব ক্রু নিরাপদে রয়েছেন। পরিবেশগত কোনও ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় হামলা:
আরও একটি বাল্ক ক্যারিয়ার বা পণ্যবাহী জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে দুবাই থেকে প্রায় ৫০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে। জাহাজটির কিছু ক্ষতি হয়েছে, তবে ক্রুরা নিরাপদে আছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।
তেল পরিবহণে বড় ধাক্কা
এই হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৭২ ঘণ্টায় মাত্র সাতটি ট্যাঙ্কার এই পথ অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে পাঁচটিই ছিল ইরানি জাহাজ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য মাত্র দুটি ট্যাঙ্কার এই রুট ব্যবহার করেছে।
এদিকে যুদ্ধঝুঁকির আশঙ্কায় বীমা সংস্থাগুলি অনেক ক্ষেত্রে কভারেজ স্থগিত করেছে। ফলে মার্স্ক ও সিএমএ সিজিএম-এর মতো বড় শিপিং সংস্থাগুলি সাময়িকভাবে তাদের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি জাহাজ উপকূলের কাছে নোঙর করে অপেক্ষা করছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের চাপ
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলির তেল রফতানিও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি ছুঁয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়া, ইউরোপ ও ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলিতে তেলের ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে। বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে হলে যাত্রাপথ অনেক দীর্ঘ হবে এবং খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এছাড়াও এলএনজি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটায় গ্যাসের দামও দ্রুত বাড়ছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির উপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।