
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এখনও অনেক দূরে, কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী পদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। বিরোধীরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করায় রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন যখন তিন বছর দূরে, তখন কেন এই আলোচনা এখনই হচ্ছে? সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রাক্তন মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে বর্ণনা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষও এই মতামতকে সমর্থন করেন, যা এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
অনেক বিরোধী দল মমতার সঙ্গে
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসেবে তুলে ধরার ধারণাটি তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (ডিএমকে) এবং শিবসেনা (ইউবিটি) এর কিছু নেতার সমর্থন পেয়েছে। তবে, কংগ্রেসের পরে লোকসভায় দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এটিকে সঠিক সময় নয় বলে অভিহিত করেছেন। অখিলেশ যাদব বলেছেন যে এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার হল পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর প্রদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে বিজেপিকে পরাজিত করা। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিরোধী দলের অভ্যন্তরে এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়গুলি সাধারণত বন্ধ দরজার পিছনে সমাধান করা হয়।
মোদীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় রাজনীতিতে এমন কয়েকজন মহিলা নেত্রীর মধ্যে একজন যিনি কোনও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছাড়াই শীর্ষে উঠেছেন। যুব কংগ্রেসে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করার পর, তিনি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করেন। তারপর থেকে, তিনি টানা তিনটি লোকসভা এবং দুটি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একজন আক্রমণাত্মক এবং লড়াকু নেত্রী হিসেবেই দেখা হয়। প্রাথমিক রাজনৈতিক দিনগুলিতে, তিনি তার আন্দোলন এবং প্রতিবাদের জন্য পরিচিত ছিলেন। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফল্য পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গোয়া, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলিতে দলকে সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। একই রকম চ্যালেঞ্জ অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সামনেও রয়েছে যারা তাঁদের নিজ নিজ রাজ্যে প্রভাবশালী কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সীমিত। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী শিবিরের মুখ করা হয়, তাহলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে, যার জাতীয় জনপ্রিয়তা অন্য যেকোনও নেতার চেয়ে অনেক বেশি। কংগ্রেস দলের একটি বড় অংশ রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ দলের জাতীয় উপস্থিতি এখনও অন্যান্য বিরোধী দলগুলির চেয়ে বেশি।
এর আগেও রাজ্যের নেতারা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন
এদিকে, ভারতীয় রাজনীতিতে কোনও একক রাজ্যের নেতার প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব নয়। ১৯৯৬ সালে, কর্ণাটকের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী নেতা জ্যোতি বসুকেও প্রধানমন্ত্রী পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার দল তা প্রত্যাখ্যান করে।
এই খেলা কি বিধানসভা নির্বাচনের জন্য?
এর আগে ২০২১ সালেও বিধানসভা ভোটের আগে মমতাকে প্রধানমন্ত্রী মুখ করা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন পড়েছিল। 'মমতা ফর পিএম '-এর এই আলোচনা ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। যা ভোটমুখী বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে প্রচারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। মমতার রাজনীতি মূলত গ্রামীণ ভোটার, মহিলা এবং সংখ্যালঘুদের জোরালো সমর্থনের উপর ভিত্তি করে। সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প, বুথ-স্তরের সংগঠন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেদন তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই রাজনৈতি বিশেষজ্ঞদের মত। বিজেপিকে বহিরাগত দল হিসেবে চিত্রিত করার কৌশলও এই পরিকল্পনার অংশ। বিশিষ্ট সাংবাদিক সুভাশিস মৈত্রও মনে করেন আঞ্চলিক কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী মুখ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ এর আগে ভিন রাজ্যের ভোটগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেশে তেমন কোনও জনভিত্তি নেই। বাংলার বিধানসভা ভোটের কারণেই এমন আওয়াজ তোলা হচ্ছে।
ইন্ডিয়া ব্লকের ঐক্য কী দুর্বল হয়ে পড়ছে?
বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লক বর্তমানে একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী জোটের চেয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেশি কাজ করছে। বিভিন্ন রাজ্যের দলগুলি তাদের নিজস্ব জোট নির্ধারণ করে। উত্তর প্রদেশে, সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস একসঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে নির্বাচনের ফলাফলের পরে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, যেমনটি অতীতে ঘটেছে। আপাতত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার আলোচনা বিরোধীদের মধ্যে কেবল একটি কৌশলগত সংকেত, যা জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের জাতীয় স্তরে উত্থান কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ।