
কাটোয়ার পানুহাটে চৈত্র সংক্রান্তির গাজন মানেই এক বিশেষ আকর্ষণ, ‘কাচ নাচ’। ওপার বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন এই লোকসংস্কৃতি আজও সমানভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন এখানকার বাসিন্দারা। আনন্দ, ভক্তি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই নাচ প্রতি বছর মাতিয়ে তোলে গোটা এলাকা।
বাংলাদেশের যশোর, ফরিদপুর, পাবনা-সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের হাত ধরেই এই ‘কাচ নাচ’-এর প্রচলন এপারে। দেশভাগের পর তাঁদের সঙ্গে এই সংস্কৃতিও চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে। এখনও সেই ধারাকে ধরে রেখেছে পানুহাটের বারুজীবী কলোনির ইয়ং বয়েজ ক্লাব।
গাজনের শেষ দু’দিন, বিশেষ করে নীল পুজোর সময়, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে এই নাচ পরিবেশন করেন শিল্পীরা। ১০-১৫ জনের একটি দল নানা পৌরাণিক কাহিনি, শিব-দুর্গা, রাম-সীতা, অসুর বধ, শিব-কালী, নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন। মুখে রঙ, পরনে সাজপোশাক, সঙ্গে ঢাক-ঢোল-সানাই, সব মিলিয়ে এক অভিনব পরিবেশ তৈরি হয়। কোথাও মুখোশ পরে ভালুক নাচ, কোথাও বা দেবদেবীর রূপ ধারণ, সবকিছুই এই ‘কাচ নাচ’-এর অঙ্গ।
এই নাচের আগে শিল্পীরা কঠোর সংযম পালন করেন। নিরামিষ আহার করে তাঁরা এই পরিবেশনায় অংশ নেন, যা এই লোকসংস্কৃতির আধ্যাত্মিক দিকটিকেও স্পষ্ট করে।
তবে এবারের গাজনের আনন্দে মিশে রয়েছে একরাশ কষ্টও। স্থানীয়দের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অনেক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সেই যন্ত্রণা নিয়েই মঞ্চে উঠছেন শিল্পীরা। তাঁদের কথায়, 'এবারের কাচ নাচ যেন একটু মনখারাপের মধ্যেই হচ্ছে। অনেকেই উদ্বেগে রয়েছেন, তবে এই নাচের মাধ্যমেই আমরা নীরবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি।'
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও, দুই বাংলার সংস্কৃতির এই অনন্য সেতুবন্ধন আজও টিকে রয়েছে। ‘কাচ নাচ’ শুধু একটি লোকনৃত্য নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ এবং পরিচয়ের এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।