
গত বিধানসভা ভোটে বাংলার ভোটবাক্সে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সাফল্য দেখার পরে একাধিক রাজ্যে এই ধরনের কর্মসূচি নিয়ে ফল পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালেই ভোটপর্বে মহারাষ্ট্রে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শিন্ডের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার চালু করেছিল ‘লাডকি বহিন’ প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের ধাঁচে এতে মহিলাদের মাসে দেড় হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। বিহার ভোটেও দেখা গিয়েছিল সেই চিত্র। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। তার আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’র সূচনা করেন। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর মধ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প বর্তমানে সর্বাধিক আলোচিত এবং জনপ্রিয় একটি নাম। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের কয়েক কোটি মহিলা মাসিক আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। বাজেটের আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার এই ভাতার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করতে পারে। সামনেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে মহিলাভাতা লক্ষ্মীর ভান্ডার নিয়ে যে কোনও বিশেষ ঘোষণা থাকতে পারে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। এবং সেই বিশেষ ঘোষণা যে অর্থবৃদ্ধির, তা-ও প্রত্যাশিত ছিল। কৌতূহল ছিল, কত বেশি। দেখা গেল, বাজেটে লক্ষ্মীর ভান্ডারে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতদিন রাজ্যের মহিলারা এই প্রকল্পটিতে পেতেন মাসে ১,০০০ টাকা করে। তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা পান মাসে ১,২০০ টাকা। নতুন ঘোষণায় তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে যথাক্রমে ১,৫০০ টাকা এবং ১,৭০০ টাকা। এর ফলে রাজ্যের ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা উপকৃত হবেন বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বর্ধিত পরিমাণ কার্যকর হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই। অর্থাৎ, বিধানসভা ভোটের আগেই মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বর্ধিত ভাতা পৌঁছে যাবে। এ জন্য আগামী অর্থবর্ষে ১৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি ভোট প্রচারের কৌশল হিসেবেই বাড়ানো হল 'লক্ষ্মী'র ভাতা ? রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের অবশ্য দাবি করছেন, 'ভোটের কথা ভেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প চালু করেননি। এবার যে ভাতা বাড়ানো হল, তা-ও কিন্তু ভোটের কথা ভেবে নয়। এতদিন যা চলছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ভাতা বেড়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলাদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন। তাই, মহিলাদের স্বনির্ভর করতেই এই উদ্যোগ।' পর্যবেক্ষকরা অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একুশের বিধানসভা ভোটের মুখে ঘোষণা করা হয় 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' প্রকল্পের কথা। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তৃণমূল সরকার ফের ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্য প্রতিমাসে এই ভাতা চালু করবে। এবং, এই 'লক্ষ্মী'র প্রতিশ্রুতিতেই ঘরের লক্ষ্মীরা দু-হাতা উপুর করে ভোট দেন তৃণমূলকে। চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে সেই ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে দ্বিগুণ করা হয়। এবং, ছাব্বিশের বিধানসভার আগে সম্প্রতি লক্ষ্মীর ভাতা আরও ৫০০ টাকা বাড়ে।
লক্ষণীয় বিষয় হল, প্রতিটি রাজ্য নারীদের জন্য বিভিন্ন পরিমাণ কিস্তি প্রদান করছে। মনে হচ্ছে কোন রাজ্য সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রদান করছে তা নিয়ে রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পগুলি রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি সরকারের মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা, মধ্যপ্রদেশ সরকারের লাডলি বহনা যোজনা, কর্ণাটক সরকারের গৃহলক্ষ্মী যোজনা। একইভাবে, অন্যান্য রাজ্যগুলিও নারী-কেন্দ্রিক প্রকল্প পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রী মাতৃবন্দনা যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা, কন্যা বিবাহ যোজনা এবং মহিলা ই-হাট যোজনার মতো অনেক প্রকল্প কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করছে। কোন রাজ্যে মহিলাদের কত সাহায্যের পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে, রাজ্যভিত্তিক তালিকার মাধ্যমে চলুন জেনে নেওয়া যাক।
দিল্লি সরকারের নারী সমৃদ্ধি প্রকল্প
এই প্রকল্পের আওতায়, যোগ্য মহিলারা প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা পান। এছাড়াও, দিল্লির রেখা গুপ্ত সরকার মুখ্যমন্ত্রী মহিলা সম্মান প্রকল্প চালু করেছে, যা মহিলাদের প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা প্রদান করে।
মধ্যপ্রদেশ সরকারের লাডলি বেহনা স্কিম
এই প্রকল্পের আওতায়, প্রতি মাসে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ১৫০০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। মধ্যপ্রদেশ সরকার ১৫ মার্চ, ২০২৩ তারিখে লাডলি বেহনা যোজনা চালু করে। মধ্যপ্রদেশ নির্বাচনে এই যোজনা বিজেপির জন্য একটি গেম চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এই যোজনার আওতায় ১,০০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল, যা পরে ১২৫০ টাকায় বাড়ান হয়। এখন তা বৃদ্ধি করে ১,৫০০ টাকা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মোহন যাদব এক বিবৃতিতে বলেছেন যে আগামী বছরগুলিতে কিস্তির পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করা হবে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকায় পৌঁছাবে।
মহারাষ্ট্র সরকারের মাঝি লাডকি বাহিন যোজনা
এই প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়া হয়। এই যোজনাটি ২৮ জুন, ২০২৪ তারিখে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের সভাপতিত্বে অনুমোদিত হয়েছিল। এই যোজনার আওতায়, ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়।
ঝাড়খণ্ড সরকারের মাইয়া সম্মান যোজনা
এই প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা দেওয়া হয়। ঝাড়খণ্ডের দরিদ্র ও অভাবী মহিলাদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য, রাজ্য সরকার মাইয়া সম্মান যোজনা পরিচালনা করছে। এই যোজনার আওতায়, ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই যোজনাটি ১,০০০ টাকা মাসিক কিস্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল, যার প্রথম কিস্তি ১৮ অগাস্ট, ২০২৪ তারিখে, রাখি বন্ধনের একদিন আগে, সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল। পরে সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করা হয়। জানা গেছে যে সারা দেশে এই ধরণের যোজনার আওতায় মহিলাদের মাসিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি ঝাড়খণ্ডে পাওয়া যায়।
হিমাচল প্রদেশের ইন্দিরা গান্ধী প্যারি বেহনা সুখ সম্মান নিধি প্রকল্প
এই প্রকল্পের আওতায়, মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা আর্থিক পেনশন দেওয়া হয়।
ছত্তিশগড় সরকারের মাহতারি বন্দন প্রকল্প
এই প্রকল্পের আওতায়, মহিলাদের প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
হরিয়ানা সরকারের লাডো লক্ষ্মী প্রকল্প
এই প্রকল্পের আওতায়, মহিলাদের প্রতি মাসে ২,১০০ টাকা দেওয়া হয়। হরিয়ানা সরকার ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লাডো লক্ষ্মী যোজনা চালু করে। এই যোজনার আওতায়, যোগ্য মহিলারা প্রতি মাসে ২,১০০ টাকা আর্থিক সহায়তা পান। ১ নভেম্বর ৫,২২,১৬২ জন মহিলার অ্যাকাউন্টে এই যোজনার প্রথম কিস্তি স্থানান্তর করা হয়। এই যোজনাটি বিশেষভাবে বিপিএল এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের মহিলাদের জন্য তৈরি।
উত্তরপ্রদেশ সরকারের নিরাশ্রিত মহিলা পেনশন প্রকল্প
এই প্রকল্পের আওতায়, মহিলাদের প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
তামিলনাড়ু সরকারের কালাইগনার মাগালির উরিমাই থগাই থিত্তম স্কিম
এই প্রকল্পের আওতায়, মহিলাদের প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
কর্ণাটকের গৃহলক্ষ্মী যোজনা
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যেও মহিলাদের জন্য একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। গৃহলক্ষ্মী যোজনার আওতায়, পরিবারের মহিলা প্রধানকে প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা দেওয়া হয়।
ভারতের প্রায় ১৫টি রাজ্যে নারীদের আর্থিকভাবে ক্ষমতায়নের জন্য নগদ সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে ভারতে এধরণের স্কিমের সূচনা হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে। পরবর্তী মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, মহারাষ্ট্রে ভোট জিততে এই স্কিমগুলির সাফল্য দেখা গিয়েছে। এবার বাংলার ভোটেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার মহিলা ভোট পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারেন বলেই মত অধ্যাপক উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গত বারের মহিলা ভোট অটুট থাকবে বরং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বাড়ার পর সেই ভোটের শতাংশ আরও বাড়তে পারে বলেন মনে করছেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট ছিল ৪৮%-এর বেশি। কিন্তু তিন বছরের মাথায় লোকসভা ভোটে তা দুই শতাংশ কমে। উল্টো দিকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিজেপি ২০২১ সালের বিধানসভা ও ’২৪ সালের লোকসভা ভোটে নিজেদের ভোট সামান্য বাড়াতে পেরেছে। দলীয় সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তৃণমূলের পক্ষে পুরুষের থেকে মহিলাদের সমর্থন তিন শতাংশ বেশি। বিজেপির মহিলা সমর্থন পুরুষের তুলনায় দুই শতাংশ কম। কিন্তু মহিলা ভোট অটুট রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। এবারের ভোটে সেটাকেই ধরে রাখতে চায় তৃণমূল কংগ্রেস। এ রাজ্যে গত ১৫ বছরে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বিলি করে মহিলাদের বড় অংশের সমর্থন তৃণমূলই পেয়েছে। ২০১৬ ও ২০২১ সালের সেই ধারা অটুট রাখতে এবারও বদ্ধপরিকর তৃণমূল নেত্রী।