
টিকাকরণ একটা সময়ে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। তবে এখন তা হাম রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। যাদের বেশিরভাগই শিশু। গত দুই দশকের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যদের বিরুদ্ধে দেশ ছাড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ২৬ এপ্রিল জানায়, এই বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৪৩ জনের হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২১৬। ডেইলি স্চারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হম আক্রান্তদের অন্তত ৯১ শতাংশ হল ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু।
১৫ মার্চ থেকে ৭ হাজার ৫০০টি হাম সংক্রান্ত ঘটনা রিপোর্ট হওয়ার পর রবিবার বাংলাগেশ জরুরি টিকাকরণ অভিযান শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, প্রায় ৭৯% আক্রান্ত শিশুদের বয়স পাঁচ বছরের নীচে।
এই সঙ্কটের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সারদার সাখওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, 'শেষবার হাম টিকা দেওয়া হয়েছিল ৮ বছর আগে।'
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধিন BNP সরকার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হয়। তার আগে ১৫ মাস ধরে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ছিল। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, যা ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাম প্রাদুর্ভাবের জন্য শেখ হাসিনা ও ইউনুস, উভয় সরকারের উপর দোষ চাপিয়েছেন। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, 'এই প্রাদুর্ভাব অতীত সরকারের সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার ফল। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট সরকার এবং সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার।' তিনি আরও বলেন, 'ওদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণ টিকার মজুদে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যা হাম সহ ৬টি অন্যান্য রোগের টিকাকেও প্রভাবিত করছে।'
বাংলাদেশে প্রতি ৪ বছরে একবার বিশেষ হাম টিকাকরণ অভিযান পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য দফতরের উপ পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বিবিসি বাংলাকে জানান, সর্বশেষ এই অভিযান হয়েছিল ২০২০ সালে। তিনি কোভিড মহামারি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এই কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার জন্য দায়ী করেছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১২ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকাকরণের হার হাম সহ নেমে দাঁড়ায় ৫৯.৬ শতাংশে।
বাংলাদেশ সরকারের এক্সপ্যান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশন (EPI)-এর অধীনে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে টিকাকরণের হার ছিল সর্বনিম্ন ৮৯% থেকে সর্বোচ্চ ১০৩%। ২০২৪ সালে তা ছিল ৮৬.৬%। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলাম ৬ এপ্রিল সরকারের কাছে একটি আইনি নোটিশ পাঠান, যেখানে মুহাম্মদ ইউনুস এবং তাঁর সরকারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানানো হয়।
আইনি নোটিশে অভিযোগ করা হয়, হাম টিকাকরণ কর্মসূচিকে সরকারি উদ্যোগ থেকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের একটি 'অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' প্রচেষ্টায় তাদের ভূমিকা ছিল।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, হাম রোগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাকরণ ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের পরিবর্তে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের এই অবৈধ উদ্যোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
ইউনুস ছাড়াও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার দাবি তোলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, নুরজাহান বেগম, সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত সহকারীরা।
সোমবার হাইকোর্ট বাংলাদেশ সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে, কেন হাম প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে ব্যর্থতাকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। একইসঙ্গে আদালত কর্তৃপক্ষকে টিকা, সিরিঞ্জ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের যথাযথ ও নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা করতে বলা হয়েছে।
এত শিশুমৃত্যু বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ টিকাকরণের ইতিহাস রয়েছে। তবে সামান্য বিঘ্নও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধে বড় ফাঁক তৈরি করতে পারে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকেই বাংলাদেশে হাম রোগে ২৫০ জনের বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।