
শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ছাড়ার ভিডিও ভাইরাল করার নেপথ্যে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। ঢাকার নদী থেকে উদ্ধার হল বাংলাদেশের সেই প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিকের দেহ। মৃতের নাম কেএম তাহসিফ সৌরি। বয়স মাত্র ২৮ বছর। বুধবার ঢাকার তুরাগ নদী থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। একদিন আগে থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। এই প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিকের মৃত্যু ঘিরে রহস্য দানা বেঁধেছে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে খুন করা হয়েছে। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার সূত্রে খবর, এমারজেন্সি নম্বর ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর তুরাগ নদী থেকে দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। টঙ্গি নদী পুলিশ ফাঁড়ির ইনস্পেক্টর ফিরোজ উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে জানিয়েছেন, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ ঢাকার উত্তরখান এলাকার রাজাবাড়ি ঘাটের কাছে দেহটি উদ্ধার হয়।
উদ্ধারের সময় কেএম তাহসিফ সৌরির পরনে ছিল সাদা প্যান্ট এবং কালো শার্ট। প্রথমে তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। পকেটে থাকা একটি আইফোনের সূত্র ধরে তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তাঁর কাছ থেকে একটি হাতঘড়িও উদ্ধার হয়েছে। পরে দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রথম আলো-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন কেএম তাহসিফ সৌরি। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, নদীতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
শেখ হাসিনার ভিডিওর জেরে খুন?
কেএম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর পরই নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পিছনে শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ছাড়ার ভিডিও ভাইরাল করার যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর খুড়তুতো বোন মোশফেকা জাহান। বৃহস্পতিবার রাত ৩টে ৪ মিনিট নাগাদ ফেসবুকে একটি পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাইকে খুন করা হয়েছে।
মোশফেকা জাহানের অভিযোগ, 'শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল সৌরিকে। ভাই নিজে ওই ভিডিও রেকর্ড করেনি। অন্য এক সহকর্মীর রেকর্ড করা ভিডিও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে শুধু শেয়ার করেছিল। কিন্তু তার জন্যই ওকে দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়।' মোশফেকা জাহান আরও অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ বায়ুসেনা থেকে অবসর নেওয়ার পরেও কেএম তাহসিফ সৌরির উপর নজরদারি চালানো হত।
শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ভিডিওর সঙ্গে কী যোগ ছিল?
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনের জেরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন হাসিনা। প্রথমে সামরিক হেলিকপ্টারে ঢাকা ছাড়েন তিনি। পরে বাংলাদেশের বায়ুসেনার C-130J হারকিউলিস বিমানে ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্দন বায়ুসেনা ঘাঁটিতে পৌঁছন। বিমানটির কলসাইন ছিল AJAX1431।
সেই সময় হাসিনার দেশ ছাড়ার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিও রেকর্ড করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে কেএম তাহসিফ সৌরির নাম জড়ায়। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে তাঁকে ওই ফুটেজের সম্ভাব্য রেকর্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তাঁর খুড়তুতো বোনের দাবি, কেএম তাহসিফ সৌরি নিজে ভিডিওটি রেকর্ড করেননি, অন্য এক আধিকারিকের তৈরি করা ভিডিও শেয়ার করেছিলেন।
কেন বায়ুসেনা থেকে অবসর নিতে হয়েছিল?
কেএম তাহসিফ সৌরির বায়ুসেনা ছাড়ার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। জাগো নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (ISPR) ২০২৫ সালের ৪ অগাস্ট তাঁর অবসর নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। সেখানে জানানো হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনেই তাঁকে অবসর দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ছিল না বলেও জানানো হয়।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনায় তাঁর অবসরের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ভিডিও বিতর্কের যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে। কেএম তাহসিফ সৌরির পরিবারেরও অভিযোগ, বায়ুসেনা ছাড়ার আগে ও পরে তাঁকে মানসিক হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছিল।
কেএম তাহসিফ সৌরির মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও ষড়যন্ত্র? আপাতত এই প্রশ্নগুলির উত্তর অধরা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে তাঁর পরিবার।